

২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। অপ্রচলিত বাজারগুলোতে আগের বছরের তুলনায় যা কমেছে ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। একই সময়ে এ বাজারে রপ্তানি আয় ৬ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার থেকে নেমে এসেছে ৬ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে।
সার্বিকভাবে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানিতে অপ্রচলিত বাজারের অংশও ১৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে কমে ১৫ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমেছে।
চীনে বাংলাদেশের রপ্তানিতে বড় লাফ
আলোচিত সময়ে নিটওয়্যার রপ্তানি ৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ কমে ৩ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। আর ওভেন পোশাক রপ্তানি ২ দশমিক ৬০ শতাংশ কমে ৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
ইপিবি জানায়, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের ৪৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ০ দশমিক ৫৮ শতাংশ কম।
দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্প ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যা আগের অর্থবছরের ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম।
এর মধ্যে নিট পোশাক রপ্তানি ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার এবং ওভেন পোশাক রপ্তানি ০ দশমিক ৬১ শতাংশ কমে হয়েছে ১৮ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার।
কেন কমলো অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি?
মূলত অপ্রচলিত বাজার অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো, রাশিয়া ও তুরস্কে রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে, যা সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে নেতিবাচক করেছে।
অপ্রচলিত বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে সাম্প্রতিক পতনের পেছনে মূলত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, ইউনিটপ্রতি রপ্তানি মূল্য হ্রাস ও কিছু বাজারে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব রয়েছে। অনেক দেশে মূল্যচাপের কারণে ক্রেতারা কম দামে পণ্য কিনছেন, ফলে রপ্তানির আর্থিক মূল্য কমে গেছে।-বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান
বৈশ্বিক উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা দুর্বল থাকায় পোশাকের চাহিদা প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা মজুত কমানো এবং সতর্ক ক্রয়নীতির কারণে নতুন অর্ডার সীমিত রেখেছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘অপ্রচলিত বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে সাম্প্রতিক পতনের পেছনে মূলত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, ইউনিটপ্রতি রপ্তানি মূল্য হ্রাস ও কিছু বাজারে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব রয়েছে।’
অনেক দেশে মূল্যচাপের কারণে ক্রেতারা কম দামে পণ্য কিনছেন, ফলে রপ্তানির আর্থিক মূল্য কমে গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একই সঙ্গে রাশিয়াসহ কয়েকটি বাজারে নিষেধাজ্ঞা ও লজিস্টিক জটিলতাও রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এছাড়া ভিয়েতনাম, ভারত, চীন ও তুরস্কের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে মূল্য ও সরবরাহ সক্ষমতার প্রতিযোগিতা আগের চেয়ে আরও তীব্র হয়েছে।’
তবে ব্রাজিল, চীন, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে বলে এই ব্যবসায়ী নেতা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, ‘এসব বাজারে আরও কার্যকর বাজারজাতকরণ, বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার, নতুন ও উচ্চমূল্যের পণ্যের উন্নয়ন এবং ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বাড়াতে পারলে অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আবারও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরবে।’
অপ্রচলিত বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। বিশেষ করে যখন প্রচলিত বাজারগুলোতে প্রতিযোগিতা, সুরক্ষাবাদী নীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো নানা চ্যালেঞ্জ বাড়ছে, তখন বাজার বৈচিত্র্যকরণের ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই।-সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘অপ্রচলিত বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। বিশেষ করে যখন প্রচলিত বাজারগুলোতে প্রতিযোগিতা, সুরক্ষাবাদী নীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো নানা চ্যালেঞ্জ বাড়ছে, তখন বাজার বৈচিত্র্যকরণের ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই।’
সরকার ও বেসরকারি খাতকে যৌথভাবে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হবে, যাতে অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের বাজার হিস্যা আরও বাড়ানো যায়। রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য, কার্যকর বাণিজ্য কূটনীতি এবং লক্ষ্যভিত্তিক বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে এসব বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করা সম্ভব বলে জানান মোয়াজ্জেম।
তিনি আরও বলেন, ‘অপ্রচলিত বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারলে তা বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানি খাতকে আরও টেকসই ও স্থিতিশীল ভিত্তি দেবে।’
দেশভিত্তিক রপ্তানির চিত্র
অস্ট্রেলিয়ায় মোট তৈরি পোশাক রপ্তানি ৯ দশমিক ১৪ শতাংশ কমে ৮১৩ দশমিক ৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে ৭৩৯ দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
ব্রাজিলে রপ্তানি ১৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেড়ে ১৬৭ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলার থেকে ১৯৭ দশমিক ৯২ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। চিলিতে ৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ কমে ১৫৭ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন ডলার থেকে নেমেছে ১৪৯ দশমিক ৮৯ মিলিয়ন ডলারে।
অন্যদিকে, চীনে রপ্তানি ১৭ দশমিক ১২ শতাংশ বেড়ে ২২৪ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন ডলার থেকে ২৬৩ দশমিক ২১ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এ প্রবৃদ্ধির পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল ওভেন পোশাক, যেখানে রপ্তানি ২৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেড়েছে।
ভারতে রপ্তানি ১১ দশমিক ৪০ শতাংশ কমে ৬৪৪ দশমিক ২৪ মিলিয়ন ডলার থেকে ৫৭০ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। নিটওয়্যার কিছুটা বাড়লেও ওভেন পোশাকের রপ্তানি ১৯ দশমিক ১৬ শতাংশ কমে যাওয়ায় সামগ্রিক রপ্তানি কমেছে।
জাপানে রপ্তানি ৪ দশমিক ২৮ শতাংশ কমে ১ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার থেকে ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানি ১০ দশমিক ৮১ শতাংশ কমে ৪১১ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন ডলার থেকে ৩৬৭ দশমিক ০৮ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
মালয়েশিয়ায় রপ্তানি ১৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেড়ে ১৮৯ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন ডলার থেকে ২১৮ দশমিক ৫৯ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ওভেন পোশাকের রপ্তানি ৪২ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেড়ে এ বাজারে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।
মেক্সিকোতে রপ্তানি ১০ দশমিক ২৯ শতাংশ কমে ৩৩২ দশমিক ৫৭ মিলিয়ন ডলার থেকে ২৯৮ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। নিউজিল্যান্ডে রপ্তানি ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ কমে ৯৩ দশমিক ৫৯ মিলিয়ন ডলার থেকে ৮৫ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
রাশিয়ায় রপ্তানি সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে। এটি ২৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ কমে ৩২৬ দশমিক ২৮ মিলিয়ন ডলার থেকে ২২৮ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
সৌদি আরবে রপ্তানি ১৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ বেড়ে ১৬১ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন ডলার থেকে ১৯২ দশমিক ১৯ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় রপ্তানি ৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ বেড়ে ১১১ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ডলার থেকে ১১৮ দশমিক ৭৯ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তুরস্কে রপ্তানি ১০ দশমিক ৯০ শতাংশ কমে ৪৪৯ দশমিক ৮৯ মিলিয়ন ডলার থেকে ৪০০ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতে রপ্তানি ১৬ দশমিক ২৩ শতাংশ বেড়ে ২৩১ দশমিক ৮৯ মিলিয়ন ডলার থেকে ২৬৯ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
সুত্র: জাগো নিউজ
