ঢাকা
১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সকাল ১০:৩২
logo
প্রকাশিত : মে ১৪, ২০২৬

উৎপাদন ব্যয় ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির চাপে বন্ধ হচ্ছে কারখানা

একদিকে কমছে আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ, অন্যদিকে বাড়ছে উৎপাদনব্যয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, বিশ্বব্যাপী জ্বালানিসংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার চাপ। সব মিলিয়ে সংকটে পড়েছে দেশের তৈরি পোশাক খাত। গত তিন বছরে অন্তত ৪০০ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, দ্রুত নীতিগত সহায়তা না পেলে এই খাতে চাপ আরো বাড়বে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে পোশাক শিল্প মালিকদের বিভিন্ন প্রস্তাবনায় এই চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৩ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তবে গত কয়েক বছরে বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ক্রেতারা পণ্যের দাম কমানোর জন্য চাপ বাড়িয়েছে। অন্যদিকে দেশে গ্যাস, বিদ্যুত্ ও ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এবং ডলারের অস্থিরতার কারণে উৎপাদনব্যয় অনেক বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির চাপ।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে শ্রমিকদের বেতন প্রায় ৫৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ছোট ও মাঝারি অনেক কারখানা ব্যয় সামাল দিতে পারছে না। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলো বিশেষ করে ভিয়েতনাম, ভারত ও চীন নিজেদের রপ্তানিকারকদের জন্য বিভিন্ন করসুবিধা ও প্রণোদনা অব্যাহত রেখেছে। ফলে বাংলাদেশের কারখানাগুলো তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, তৈরি পোশাক খাত মূলত ‘ফ্যাশন ও সময়নির্ভর’ ব্যবসা। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। কিন্তু বর্তমানে সাব-কন্ট্রাক্ট কার্যক্রম, কাস্টমস প্রক্রিয়া ও বন্ড সুবিধায় জটিলতা বেড়ে যাওয়ায় সময়মতো উৎপাদন ও জাহাজীকরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সম্প্রতি ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে জাহাজ ভাড়া, কার্গো বিমান ভাড়া বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় সরকারের কাছে নীতি-সহায়তা চান উদ্যোক্তারা।

জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘বর্তমানে আগের মতো জ্বালানিসংকট নেই। এটি অনেকাংশেই কমে গেছে। আশা করছি সামনে এটি আরো কমবে। বন্ধ কারখানাগুলো নিয়ে ইতিমধ্যেই একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সামনের বাজেটে আমাদের বেশ কিছু চাওয়া-পাওয়া রয়েছে। এনবিআর ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মিটিং হয়েছে। আমরা ইতিমধ্যেই আমাদের দাবিগুলো সরকারের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। আশা করছি বাজেটের পর ব্যবসার পরিধি বাড়বে।’

পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা জানান, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা নির্ধারিত ‘লিড টাইম’ অত্যন্ত কঠোরভাবে অনুসরণ করে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ না করতে পারলে অনেক ক্রেতা ডিসকাউন্ট দাবি করে, বিলম্বে অর্থ পরিশোধ করে অথবা অর্ডার বাতিল করে দেয়। এতে রপ্তানিকারকরা সরাসরি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। অনেক ক্ষেত্রে কারখানাগুলো অর্ডার হারিয়ে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রেও বাড়ছে জটিলতা। পোশাক শিল্পে প্রতিনিয়ত নতুন ডিজাইন, নতুন কাপড়, নতুন রং ও ভিন্নধর্মী এক্সেসরিজ ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু এইচএস কোড সংযোজন এবং কাস্টমস যাচাইয়ে দীর্ঘসূত্রতার কারণে কাঁচামাল খালাসে বিলম্ব হচ্ছে। ফলে আমদানিকারকদের অতিরিক্ত ডেমারেজ চার্জ গুনতে হচ্ছে এবং অনেক সময় জরুরি চালান এয়ার শিপমেন্টে পাঠাতে হচ্ছে, যা ব্যয় আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।

করনীতিও শিল্পের জন্য বড় চাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বর্তমানে পোশাকশিল্পের জন্য করপোরেট ট্যাক্স হার ১২ শতাংশ এবং গ্রিন কারখানার জন্য ১০ শতাংশ নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে কর নির্ধারণের সময় বিভিন্ন আয় ও ব্যয়কে ‘অনুমোদনযোগ্য নয়’ এমন দেখিয়ে প্রচলিত উচ্চ হারে কর আরোপ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উদ্যোক্তাদের। তারা বলছেন, এতে ঘোষিত করসুবিধার বাস্তব সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

এছাড়া নগদ সহায়তার ওপর ১০ শতাংশ উেস করও শিল্পের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ব্যবসায়ীরা এই হার কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নগদ প্রবাহ ধরে রাখা কারখানাগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘বিশ্ববাজারে কোনো কিছুর দাম বৃদ্ধি পেলে সরকারের সেখানে সাশ্রয়ী হওয়ার পাশাপাশি দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প থাকে না। তবে ব্যবসায়ীরাও যেন চাপে না পড়ে, সেজন্য একদিকে অসুবিধা হলে অন্যদিকে সুবিধা দিতে হবে। তাই সরকারের উচিত হবে ব্যবসায়ীদের দ্রুত সময়ে নীতিসহায়তা প্রদান করা।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়ে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার পরিমাণও কমেছে। এটি শিল্পে নতুন রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত নীতিগত সহায়তা না দিলে আরো কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

তবে শিল্পসংশ্লিষ্টরা এখনো আশাবাদী। তারা বলছেন, সরকার যদি কর ও ভ্যাট কাঠামো সহজ করে, বন্ড ও কাস্টমস প্রক্রিয়া দ্রুততর করে এবং রপ্তানিকারকদের জন্য বাস্তবসম্মত সহায়তা নিশ্চিত করে, তাহলে বাংলাদেশ আবারও বৈশ্বিক বাজারে শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পারবে।

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram