

বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনীতির দেশ জাপান। দেশটিতে রয়েছে দক্ষ কর্মীর ব্যাপক চাহিদা। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে সুশৃঙ্খল ও উন্নত দেশ জাপান যেতে আগ্রহী হচ্ছেন বাংলাদেশি তরুণরা। তবে এ সুযোগ পেতে প্রয়োজন জাপানি ভাষায় দক্ষতা ও নির্দিষ্ট কাজের যোগ্যতা।
ভাষা শেখা থেকে শুরু করে জাপানে যাওয়ার প্রস্তুতি, সবকিছুতেই এখন বাড়ছে বিদেশগামীদের আগ্রহ ও অংশগ্রহণ।
রাজধানীর মিরপুর-২ নম্বর সেকশনে অবস্থিত বাংলাদেশ জার্মান কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কারিকুলাম ও নিবিড় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জাপানি ভাষার এন-৫ ও এন-৪ লেভেল শিখছেন শিক্ষার্থীরা। ভাষা শেখার পাশাপাশি জাপানে যাওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি, টেকনিক্যাল ইন্টার্নশিপ, বিশেষ দক্ষকর্মী ও স্টুডেন্ট ভিসা—নিয়েও দেওয়া হচ্ছে দিকনির্দেশনা।
প্রতিষ্ঠানটিতে দুটি ব্যাচে ৮০ জন শিক্ষার্থী জাপানি ভাষা শিখছেন। কেউ এসএসসি-এইচএসসি পাস, কেউ ডিগ্রি বা স্নাতক শেষ করে জাপান যাওয়ার উদ্দেশ্যে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে একটি ‘হাইব্রিড ব্যাচে’ জাপানের একজন শিক্ষক অনলাইনে ক্লাস নেন। এছাড়া বিএমইটির নিয়োগপ্রাপ্ত একজন শিক্ষক রয়েছেন, যিনি এন-৪ লেভেল সম্পন্ন করেছেন এবং জাপান থেকেছেন। চুক্তিভিত্তিক একজন কোর্স কো-অর্ডিনেটর রয়েছেন।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানে এন-৫ ও এন-৪ লেভেলের কোর্স সাধারণত ছয় মাসের হয়। প্রতিদিন চার ঘণ্টা করে ক্লাস নেওয়া হয় এবং মাসে ২০ দিন ক্লাস করেন শিক্ষার্থীরা।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সূত্র জানায়, ঢাকাসহ দেশের ২০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (টিটিসি) জাপানি ভাষা শেখানো হয়। এর মধ্যে ঢাকার তিনটি টিটিসিতে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ও দক্ষ শিক্ষক রয়েছেন। সাধারণত বছরে চারবার এই টিটিসিগুলোতে ভর্তির বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। জানুয়ারি, এপ্রিল, অক্টোবর ও ডিসেম্বর-এই চার মাসে বিএমইটির ওয়েবসাইট ও টিটিসির ওয়েবসাইটে ভর্তির বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। প্রতি ব্যাচে ৪০-৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়।
বিজ্ঞপ্তির পর ভাষা শিখতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের আবেদন করতে হয়। আবেদন করতে হলে ন্যূনতম এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস থাকতে হয়ে। এরপর যে প্রতিষ্ঠানে ভাষা শিখবে সেখানে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে ভর্তি হওয়া যায়। রেগুলার কোর্সে ভর্তি ফি এক হাজার টাকা, হাইব্রিড কোর্সে ভর্তি ফি তিন হাজার টাকা।
বাংলাদেশ-জার্মান কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ ফৌজিয়া আনার বলেন, ঢাকার মধ্যে বাংলাদেশ-কোরিয়া কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও শেখ ফজিলাতুন্নেছা টিটিসিতেও একইভাবে জাপানি ভাষা শেখানো হয়। প্রতি ব্যাচে ৪০ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। আমাদের এখানে বর্তমানে ৮০ জন শিক্ষার্থী ভাষা শিখছেন।
অধ্যক্ষ বলেন, শিক্ষার্থীরা ধৈর্য ধরে লেগে থাকলে ভাষা শেখা সম্ভব। তবে সবাই সেই ধৈর্য ধরে রাখতে পারে না। আমাদের এখানে আইএম জাপান প্রকল্পের আওতায় এক মাসের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ভাষা শিখে অনেক শিক্ষার্থী এই প্রকল্পের মাধ্যমে পরীক্ষা দিয়ে জাপান গেছেন।
জাপানে যাওয়ার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, জাপানের নিয়ম-কানুন অত্যন্ত কঠোর। সামান্য ব্যতিক্রম হলেই বাদ দেওয়া হয়। তারা মিথ্যা পছন্দ করে না। ভাষা জানার পাশাপাশি দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা; সব মিলিয়ে যোগ্য হতে হয়।
প্রতিষ্ঠানটির জাপানি ভাষার শিক্ষক উজ্জ্বল কুমার বর্মণ বলেন, ‘ক্লাসে আমরা রিডিং, রাইটিং ও স্পিকিং—এই তিনটি বিষয়েই গুরুত্ব দেই। শিক্ষার্থীরা মনোযোগী হলে ছয় মাসেই ভাষা শেখা সম্ভব। তবে যে কোনো ভাষার ক্ষেত্রে নিয়মিত অনুশীলন জরুরি। আমরা গ্রুপভিত্তিক স্পিকিং প্র্যাকটিসও করাই।’
তিনি আরও বলেন, স্টুডেন্ট ভিসা থেকে শুরু করে কাজের ভিসায় যাওয়ার জন্যই মূলত সবাই ভাষা শেখে। কেউ এন-৫ পাস করে ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্সে যায়। আবার এন-৪ সম্পন্ন করে অনেকেই স্পেসিফাইড স্কিলড ওয়ার্কার (এসএসডব্লিউ) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জাপানে চাকরির সুযোগ পায়।
মিরপুরের এই প্রতিষ্ঠানে জাপানি ভাষা শিখছেন রকিবুল ইসলাম। তিনি এইচএসসি পাস করে জাপান যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমার ইচ্ছা ল্যাংগুয়েজ কোর্সে জাপান যাবো। খুব বেশি কোনো কারিগরি দক্ষতা আমার নেই। এখানে এন-৫ শিখে জাপান গিয়ে ল্যাংগুয়েজ কোর্স করে পরে ব্যাচেলরে ভর্তি হবো। এর মধ্যে পার্ট টাইম কাজ করার সুযোগও রয়েছে। চেষ্টা করে যাচ্ছি, দেখা যাক কী হয়।’
আইএম জাপান প্রকল্পে সুযোগ
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, জাপানে অনুমোদিত ৯৬টি রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে মাত্র ৩০টি নিয়মিত কর্মী পাঠাচ্ছে। ২০০৪ থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ২০ বছরে মাত্র ৫ হাজার ১৪ জন কর্মী জাপানে যেতে পেরেছেন।
এছাড়া ‘আইএম জাপান’ প্রকল্পের মাধ্যমে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৭০২ জন কর্মী জাপানে গেছেন, যেখানে তুলনামূলকভাবে কম খরচে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
জাপানের শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করতে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ‘জাপান সেল’ গঠন করেছে। বর্তমানে টেকনিক্যাল ইন্টার্ন ট্রেনিং প্রোগ্রাম (টিআইটিপি) এবং স্পেসিফাইড স্কিলড ওয়ার্কার (এসএসডব্লিউ)—এই দুই ক্যাটাগরিতে কর্মী পাঠানো হচ্ছে।
এই ভিসার জন্য প্রার্থীকে অন্তত ১৭-১৮ বছর বয়সী হতে হবে এবং জাপানি ভাষার এন-৪ লেভেল পাস করতে হবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট খাতে দক্ষতা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। বর্তমানে কৃষি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কেয়ারগিভিং ও ড্রাইভিং—এই চারটি খাতে পরীক্ষা দেওয়া যায়। এর মধ্যে কেয়ারগিভিং ও কৃষিখাতে চাহিদা বেশি।
এই ভিসার জন্য ন্যূনতম ১৮ বছর বয়স এবং এন-৫ লেভেলের ভাষা দক্ষতা প্রয়োজন। এই প্রোগ্রামের আওতায় জাপানে শতাধিক ধরনের কাজে যোগদানের সুযোগ রয়েছে।
এন-৫ লেভেল সম্পন্ন করে শিক্ষার্থীরা জাপানের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১ থেকে ২ বছরের ভাষা শিক্ষা কোর্সে ভর্তি হতে পারেন। পরে তারা উচ্চশিক্ষা বা স্কিল ডেভেলপমেন্ট কোর্সে যেতে পারেন এবং পার্ট-টাইম কাজের সুযোগ পান।
ভাষা দক্ষতা যাচাইয়ের পরীক্ষা
জাপানি ভাষা দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য দুটি আন্তর্জাতিক পরীক্ষা রয়েছে—জাপানিজ ল্যাঙ্গুয়েজ প্রফিসিয়েন্সি টেস্ট (জেএলপিটি) এবং জাপান ফাউন্ডেশন টেস্ট (জেএফটি)। জাপানে কাজ বা পড়াশোনার জন্য এই পরীক্ষাগুলোর যে কোনো একটিতে উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক।
জাপান ড্রিম একাডেমির উপাধ্যক্ষ মো. লিমন হোসাইন বলেন, জাপানে যেতে হলে প্রথমে এন-৫ বা এন-৪ পাস করতে হয়। এরপর টিআইটিপি বা এসএসডব্লিউ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। পরে তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে জাপানি প্রতিষ্ঠানের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়।
সুত্র: জাগো নিউজ

