ঢাকা
২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সকাল ৯:৩৫
logo
প্রকাশিত : এপ্রিল ৭, ২০২৬

হারিয়ে যাচ্ছে টেলিফোন, এক যুগে গ্রাহক কমেছে ৫ লাখ

দেশ থেকে যেন হারিয়ে যেতে বসেছে টেলিফোন বা ল্যান্ডফোন। কারও বাসাবাড়িতে এখন এই ফোন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অফিস-আদালতেও এই ফোনের ব্যবহার নেমে এসেছে প্রায় শূন্যের কোঠায়। ২০১৩ সালেও যেখানে টেলিফোনের গ্রাহক ছিল সাড়ে ৮ লাখ, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা কমে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৩ লাখে। মাত্র এক যুগেই টেলিফোনের গ্রাহক কমেছে প্রায় ৫ লাখ, যা বর্তমান গ্রাহকের প্রায় দেড়গুণ। এর কারণ হিসেবে উন্নত প্রযুক্তির পাশাপাশি উঠে আসছে টিঅ্যান্ডটির সার্ভিসের মান।

টেলিফোন একসময় পরিচিত ছিল টিঅ্যান্ডটি ফোন নামে। বাংলাদেশ তার ও টেলিফোন বোর্ডের (বিটিটিবি) অধীনে এই টেলিফোন সেবাদান কার্যক্রম পরিচালিত হতো। তখন বিটিটিবি ছিল দেশের টেলিযোগাযোগ সেবার একমাত্র প্রতিষ্ঠান। বিটিটিবি বিলুপ্ত করে ২০০৮ সালে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) গঠন করা হয়।

প্রযুক্তির প্রসারে মানুষ টেলিফোন থেকে বিমুখ হয়েছে। তবে এই গ্রাহক কমার পেছনে নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বিটিসিএলের ভূমিকাও কম নয়। বর্তমানে গ্রাহক টানতে বিটিসিএলও প্রযুক্তিবান্ধব নতুন নতুন সেবা নিয়ে আসছে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট গ্রাহক টানতে প্যাকেজের দাম ঠিক রেখে স্পিড বাড়ানো হয়েছে তিনগুণ। চালু করা হয়েছে আইপি কলিং সেবা ‘আলাপ’। এতে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন গ্রাহকও। তথ্য পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, সারাবিশ্বের মতোই বাংলাদেশে টিঅ্যান্ডটি ফোনের গ্রাহক কমেছে। প্রযুক্তির প্রসারে টিঅ্যান্ডটি ফোনকে এখন নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হচ্ছে। গ্রাহক বাড়াতে বিটিসিএল নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। নতুন করে জিপন নামের একটি সেবার মাধ্যমে ইন্টারনেট ও টিঅ্যান্ডটি ফোনের সেবা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রাহক বাড়াতে ইন্টারনেট সেবায় এখন ফোকাস করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, প্রযুক্তির প্রসারে টিঅ্যান্ডটির ফোন কমেছে। এটি একটি কারণ। অন্যটি হচ্ছে- তাদের সার্ভিসের মান। ল্যান্ডলাইনের বিকল্প হিসেবে আইপি ফোন এসেছে, যেগুলো প্রাইভেট কোম্পানি দিচ্ছে ও তাদের সার্ভিস তুলনামূলক ভালো। সরকারি প্রতিষ্ঠানে নানা কারণে দক্ষ জনবল সংকট থাকে, করাপশনও থাকে, ফলে গ্রাহকদের প্রত্যাশিত সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। এজন্য অনেকেই বিটিসিএলের ল্যান্ডলাইন ছেড়ে আইপি টেলিফোনে চলে গেছে।

ঠিক সময়ে সেবা না পেয়েও কমেছে গ্রাহক
কেবল প্রযুক্তির প্রসারেই নয়, অব্যবস্থাপনার কারণেও কমেছে টিঅ্যান্ডটি ফোনের গ্রাহক। লাইন ঠিক করে না দেওয়াসহ ঠিক সময়ে সেবা না পাওয়ার কারণেও মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে টিঅ্যান্ডটি থেকে।

এমনই একজন হলেন মিরপুরের শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা সাদ ইবনে কিবরিয়া। ছোটবেলা থেকেই তিনি টিঅ্যান্ডটি ফোন ব্যবহার করে আসছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে তাদের লাইন নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। তারাও আর লাইন ঠিক করেননি, বিটিসিএলও লাইন ঠিক করানোর জন্য খোঁজ-খবর নেয়নি।

সাদ ইবনে কিবরিয়া বলেন, ‘আমাদের টিঅ্যান্ডটি লাইন ছাড়ার মূল কারণ হচ্ছে এটা প্রায়ই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিভিন্ন জায়গায় তার ছিঁড়ে যায়। তার চুরি হয়ে গেলে আমাদের নিজের টাকা দিয়েই কিনে দিতে হয়। এগুলো ঠিক করতে সময়ও লাগে। প্রতিবার কমপ্লেইন দিলেও লাইন ঠিক করানো, এগুলো খুবই বিরক্তিকর। এসব কারণে কবে শেষ লাইন নষ্ট হয়েছে খেয়াল নেই, আর কল দিয়ে ঠিক করানোও হয়নি। টিঅ্যান্ডটি অফিসও এ ব্যাপারে আমাদের কোনোদিন নক করেনি। এভাবেই বন্ধ হয়ে আছে বছরখানেক ধরে।’

প্রায় একই কথা বলেন ফার্মগেটের বাসিন্দা নাহিয়ান মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘টিঅ্যান্ডটি ফোনের কথা এখনও মনে পড়ে। শেষ কবে টেলিফোনটি ব্যবহার করেছি এখন আর মনে নেই। কারণ কিছুদিন পরপর লাইন কেটে যেত। লাইন ঠিক করাতে অনেকটা ধরনা ধরতে হতো অফিসে। আর সরকারি অফিসের সেবা বলে কথা। কখনও ঠিক সময়ে সেবা পাওয়া যেতো না।’

বড় কারণ বিটিসিএলের সার্ভিস
এ প্রসঙ্গে বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, ফিক্সড ল্যান্ডলাইনের পপুলারিটি সারাবিশ্বেই কমেছে। মোবাইল আসার পরে এর যে সুযোগ-সুবিধা, আপনি ফোনটা সবসময় সঙ্গে রাখতে পারেন, যেখানেই যান ব্যবহার করতে পারেন, এই সুবিধাটা বড় বিষয়। ল্যান্ডলাইনে ফোনবুক ইন্টিগ্রেটেড থাকে না, নম্বর মুখস্থ রাখতে হয় বা দেখে ডায়াল করতে হয়। কিন্তু মোবাইলে অ্যাড্রেস বুক থেকে সরাসরি ডায়াল করা যায়, কলার আইডিও দেখা যায়। এই সুবিধাগুলোর কারণে মূলত ল্যান্ডলাইনের জনপ্রিয়তা কমেছে। এর বাইরে বিটিসিএলের সার্ভিসের মানের কারণেও গ্রাহক কমেছে।

বিটিসিএলের তথ্যমতে, ২০১৩ সালে টিঅ্যান্ডটি ফোনের গ্রাহক ছিল ৮ লাখ ৪৫ হাজার ৫৫২ জন। এরপর ধারাবাহিকভাবে প্রতি বছরই গ্রাহক কমছে।

২০১৪ সালে গ্রাহক ছিল ৭ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭১, ২০১৫ সালে ৬ লাখ ৯৬ হাজার ৩৫৮, ২০১৬ সালে ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৬৯১, ২০১৭ সালে ৬ লাখ ১৩ হাজার ৬৬৬, ২০১৮ সালে ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৫৮৩, ২০১৯ সালে ৫ লাখ ১৯ হাজার ৯৯৪ ও ২০২০ সালে ৪ লাখ ৯৫ হাজার ৮০৭ জন।

২০২১ সালে টিঅ্যান্ডটি ফোনের গ্রাহক ছিল ৪ লাখ ৭৪ হাজার ১৭৯, ২০২২ সালে ৪ লাখ ৬১ হাজার ৮৯৬, ২০২৩ সালে ৪ লাখ ২৯ হাজার ৯০৩, ২০২৪ সালে ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৪৩৯ ও ২০২৫ সালে গ্রাহক নেমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৪৩১ জনে। সর্বশেষ তথ্যমতে, চলতি (২০২৬) সালের জানুয়ারিতে গ্রাহক কিছুটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৫৫ হাজার ২৮২ জনে।

বিটিসিএলের ফোকাস এখন ইন্টারনেটে
ল্যান্ডলাইন বা টিঅ্যান্ডটি ফোনের গ্রাহক কমায় বিটিসিএল এখন ডেটা বা ইন্টারনেট সেবায় মনোযোগ দিচ্ছে। দেশে বর্তমানে বিটিসিএলের জিপন গ্রাহকের সংখ্যা ১ লাখ ৯ হাজার ৪২৫। এডিএসএলের গ্রাহক ৭ হাজার ৬৭৬। এলএলআই গ্রাহক ২ হাজার ৪৬৮ জন। প্রতিষ্ঠানটি এখন দেশব্যাপী বিস্তৃত অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে জিপন ও এলএলআই সেবা দিচ্ছে।

জিপনের আওতায় ৬৪ জেলায় জিপন ওয়াইফাই সেবা চালু রয়েছে। জেলা শহর ছাড়াও বর্তমানে কিছু কিছু উপজেলায়ও জিপন ওয়াইফাই সেবা রয়েছে। এছাড়া সব জেলা, প্রায় সব উপজেলা এবং ১ হাজার ২১৬টি ইউনিয়নে বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার বিস্তৃত। এর মাধ্যমে লিজড লাইন ইন্টারনেট (এলএলআই) সেবা বা ডেডিকেটেড লাইনের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা দেওয়া হচ্ছে।

বিটিসিএল জানায়, ২০২১ সাল থেকে বিটিসিএলের আইপি টেলিফোন অ্যাপ ‘আলাপ’ চালু রয়েছে। এছাড়া বর্তমানে আইটি পিবিএক্স সার্ভিস চালুর কার্যক্রম চলমান।

ল্যান্ডফোনের বিকল্প হিসেবে এসেছে ‘আলাপ’
বিটিসিএল জানিয়েছে, নতুন প্রযুক্তির প্রসারে সারাবিশ্বের অন্যান্য দেশের মতোই ল্যান্ডফোন গ্রাহকের সংখ্যা কমেছে। একইসঙ্গে ইন্টারনেট ও ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন প্রযুক্তির চাহিদা বেড়েছে। যুগের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ২৬ মার্চ ২০২১ সালে বিটিসিএল টেলিফোন সেবায় যুক্ত করেছে আইপি কলিং সেবা ‘আলাপ’। ফ্রি অননেট কল (আলাপ টু আলাপ), সাশ্রয়ী অফনেট কল (আলাপ টু মোবাইল ও ফিক্সড ফোন), মেসেজিং, ভিডিও কলসহ আকর্ষণীয় ফিচারসমৃদ্ধ এই আইপি কলিং সেবার গ্রাহকসংখ্যা বেড়ে ১৬ লাখ ৮১ হাজারে দাঁড়িয়েছে, যা বিটিসিএলের টেলিফোন গ্রাহকের প্রায় পাঁচগুণ। এর সঙ্গে সম্প্রতি এসএমএস গেটওয়ে ও ওয়ালেট সেবা চালু করা হয়েছে। ফলে আলাপ থেকে সব মোবাইল অপারেটরে এসএমএস পাঠানো যাচ্ছে এবং আলাপে রিচার্জ করে বিটিসিএলের বিভিন্ন সেবার বিল দেওয়া যাচ্ছে।

ইন্টারনেট গ্রাহক বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ
গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবা প্রসারে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানিয়েছে বিটিসিএল। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, গ্রাহক পর্যায়ে অপটিক্যাল ফাইবারভিত্তিক ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট প্যাকেজের মূল্য অপরিবর্তিত রেখে স্পিড ৩ গুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এরমধ্যে ৩৯৯ টাকায় ২০ এমবিপিএস, ৫০০ টাকায় ২৫ এমবিপিএস, ৮০০ টাকায় ৫০ এমবিপিএসসহ আকর্ষণীয় প্যাকেজ সংবলিত সেবা গ্রাহক চাহিদায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বর্তমানে এ সেবার গ্রাহক সংখ্যা ১ লাখ ১৫ হাজারের বেশি।

এছাড়া ডোমেইন রিসেলার নিয়োগ ও দাম কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। জাতীয় পরিচয়মূলক ডোমেইন বিডি ও বাংলা ডোমেইনকে আরও সেবাবান্ধব করতে প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানদের রিসেলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এপিআই ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে আগের তুলনায় দ্রুত ডোমেইন কেনা যায়। এছাড়া, অক্টোবর ২০২৫ এ সেকেন্ড লেভেল বিডি ডোমেইন উন্মুক্ত হয়েছে এবং একই সঙ্গে ডোমেইন সেবায় আকর্ষণীয় মূল্যছাড় দেওয়া হয়েছে।

নানান উদ্যোগ সত্ত্বেও বিটিসিএলের গ্রাহক না বাড়ার কারণ প্রসঙ্গে বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, গ্রাহক বাড়ছে না- এর প্রধান কারণ একই, সার্ভিসের অভাব। মানুষের আস্থা বিটিসিএলের ওপর খুবই কম। ফলে ‘জিপন’ ইন্টারনেট বা অন্য কোনো সেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাহক কনফিডেন্স পায় না। তারা মনে করে, সেবা ভালো নাও হতে পারে- এটি বড় একটি কারণ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব মিলিয়ে প্রযুক্তির অগ্রগতি ও সেবার দুর্বলতায় টিঅ্যান্ডটি ফোন এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। বিটিসিএল এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের কর্মকর্তারাও তা অস্বীকার করছেন না।

সুত্র: জাগো নিউজ

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram