

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে জ্বালানি তেল নিতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন গ্রাহকরা। এবার জ্বালানি নিয়ে এই অস্থিরতার প্রভাব পৌঁছালো সাধারণ মানুষের রান্নাঘরেও।
তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজির) দাম এক ধাক্কায় কেজি প্রতি প্রায় ৩৩ টাকা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। বাসাবাড়ি কিংবা ছোট রেস্তোরাতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারে এখন ৩৮৭ টাকা বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে।
রেকর্ড দামে কিনতে রাজি হয়েও ভোক্তারা সিলিন্ডার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করছেন। বিক্রেতারা বলছেন, ডিলারদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় বাজারে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বিইআরসি থেকে ২ এপ্রিল দাম সমন্বয় করার পর এখন বাজারে ৫.৫ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৭৭ টাকা বেড়ে ৭৯২ টাকা, ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৩৮৭ টাকা বেড়ে এক হাজার ৭২৮ টাকা, ১২.৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৪০৪ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৮০১ টাকা, ১৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৬৭৬ টাকা থেকে ২ হাজার ১৬১ টাকা, ১৬ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৭৮৮ টাকা থেকে ২ হাজার ৩০৫ টাকা, ১৮ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ১১ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৫৯৩ টাকা, ২০ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৬৪৬ টাকা বেড়ে দুই হাজার ৮৮১ টাকা, ২২ কেজি সিলিন্ডারের ২ হাজার ৪৫৮ টাকা থেকে বেড়ে ৩ হাজার ১৬৯ টাকা, ২৫ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৮০৭ টাকা বেড়ে তিন হাজার ৬০১ টাকা, ৩০ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৯৬৯ টাকা বেড়ে চার হাজার ৩২১ টাকা, ৩৩ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৩ হাজার ৬৮৭ টাকা থেকে বেড়ে ৪ হাজার ৭৫৩ টাকা, ৩৫ কেজি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ১৩০ টাকা বেড়ে পাঁচ হাজার ০৪১ টাকা এবং ৪৫ কেজি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৪০০ টাকা বেড়ে ছয় হাজার ৪২৮ টাকা হয়েছে।
এদিকে হঠাৎ এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বৃদ্ধিতে ক্ষোভ প্রকাশ করছে সাধারণ মানুষ। ঢাকার রায়েরবাজারে গ্যাস সিলিন্ডারের নিতে এসে দাম শুনে অবাক গৃহিণী শামীমা আক্তার।
তিনি বলেন, “আমাদের বাসায় লাইনের গ্যাস নেই। তাই সিলিন্ডার গ্যাসের প্রতি আমরা নির্ভরশীল। গত মাসে একটি সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার নিয়েছি ২ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে তাও অনেক খোঁজাখুঁজির পর পেয়েছি। এ মাসে যদি আবার নতুন করে দাম বাড়ায় তাহলে আমাদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষেরা কীভাবে রান্না করে খাব। এমনিতেই মাছ মাংসসহ সব কিছুর দাম বাড়তি, এখন যদি গ্যাসের দাম আবার বাড়ে তাহলে আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে।”
মোহাম্মদপুরের টাউন হলে বাসার জন্য গ্যাস সিলিন্ডার নিতে আসেন বেসরকারি চাকরিজীবী আমজাদ কবির। তিনি বলেন, “বাজারে সবকিছুর দাম বাড়তি দেখলাম। গ্যাস নিতে আসলাম সেখানেও দাম বেশি। আমার কাছে সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার চেয়েছে ২ হাজর ৩০০ টাকা। কিছু করার নাই, খেতে হলে নিতে হবে। তাই বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে নিচ্ছি।”
কারওয়ান বাজারের রান্নার জন্য সিলিন্ডারের গ্যাস নিতে এসেছেন আরেকজন চাকরিজীবী রাইদা রহমান।
তিনি বলেন, “বেতন তো প্রতিমাসে বাড়ে না। কিন্তু জিনিসপত্রের দাম প্রতি মাসেই বাড়তেছে। সবচেয়ে বড় ভেল্কিবাজি হলো দাম বাড়ার ঘোষণা আসার সাথে সাথে বাজার থেকে সিলিন্ডার গায়েব হয়ে যাওয়া। রেকর্ড দামে কিনতে রাজি হওয়ার পরও বাজারে গ্যাস পাচ্ছি না। এটা কি কৃত্রিম সংকট নাকি সিন্ডিকেট সেটা প্রশাসন কেন দেখছে না? আমাদের পকেট কাটা হচ্ছে আর আমরা সেবাও পাচ্ছি না।”
একই বাজারের এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রেতা সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, “মানুষ আমাদের গালমন্দ করছে, কিন্তু আমাদের হাত পা বাঁধা। আমরা বড় ডিলারদের কাছে ৫০টা সিলিন্ডারের অর্ডার দিয়ে ১০টাও পাচ্ছি না। কোম্পানিগুলো বলছে সরবরাহ কম। বেশি দামে কিনে এনেছি ঠিকই, কিন্তু মানুষ যখন নতুন দাম শুনছে তখন আর কিনতে চাইছে না।”
রাজধানীর নিউমার্কেটের এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবসায়ী মো. নুরনবী সিকদার বলেন, “দাম বাড়ার পর থেকে বাজারে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কোম্পানিগুলো ঠিকমতো সাপ্লাই দিচ্ছে না, আর গ্রাহকরা ভাবছে আমরা বুঝি বেশি লাভের আশায় গ্যাস লুকিয়ে রেখেছি। অথচ আমাদের দোকানে এখন অর্ধেকের বেশি সিলিন্ডার খালি পড়ে আছে। বিক্রি কমে যাওয়ায় দোকানের ভাড়াই উঠবে কি না সন্দেহ। রেকর্ড দাম দিয়েও যখন মাল পাই না, তখন সাধারণ মানুষের ক্ষোভ মেটানো আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।”
বিইআরসির সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে এখন সারাবিশ্বে জ্বালানি নিয়ে একটি সংকট তৈরি হয়েছে। প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়। আমরা বিশ্ব বাজারে সঙ্গে সমন্বয় করে এপ্রিল মাসে জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের এলপিজির খুচরা মূল্য নির্ধারণ করেছি ১ হাজার ৭২৮ টাকা। এছাড়া, সারাদেশে এলপিজি মনিটরিং করার জন্য কমিটি করে দিয়েছি। তারা নিবিড়ভাবে কাজ করছে।”
তিনি আরো বলেন, “আমাদের পাইপলাইনে কয়েকটি জাহাজ রয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। নতুন দাম নির্ধারণ করলে আমরা সঙ্গে সঙ্গেই জেলা প্রশাসক, ভোক্তা অধিদপ্তরকে জানিয়ে দেই। দাম যাতে বেশি নিতে না পারে সেজন্য এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সব সময় সক্রিয় থাকে।”
