

ঋণের অঙ্ক যত বড়, ঝুঁকিও তত বেশি; ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের চিত্রে সেটিই স্পষ্ট। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১ কোটি টাকার মধ্যে দেওয়া ছোট ঋণের খেলাপি হার যেখানে ১৪ শতাংশের কম, সেখানে ৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বের বড় ঋণে এই হার প্রায় ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ বড় ঋণে খেলাপির হার ছোট ঋণের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। বড় ঋণের গুণগত মানের এই অবনতি ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকটের পেছনে মূলত বড় করপোরেট গ্রুপ ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের ভূমিকা বেশি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই প্রবণতা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
কারণ বড় ঋণের খেলাপি শুধু ব্যাংকের আর্থিক অবস্থাকেই দুর্বল করে না, বরং পুরো অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে নাড়িয়ে দিতে পারে। বড় গ্রাহকরা ঋণ পরিশোধ না করলে ব্যাংকের মূলধন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমনকি আমানতকারীদের অর্থও ঝুঁকির মুখে পড়ে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে এখনই শক্তিশালী নজরদারি, কঠোর ঋণ মূল্যায়ন এবং বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প নেই।
টানা বৃদ্ধির পর ডিসেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণে কিছুটা লাগাম পড়েছে। তিন মাসে খেলাপি ঋণ প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা কমে গত ডিসেম্বরে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩১ শতাংশ। মূলত নীতি সহায়তার আওতায় নামমাত্র ডাউনপেমেন্টে ঢালাও পুনঃতফসিল, শিথিল নীতিমালার আওতায় অবলোপন বৃদ্ধি এবং ডিসেম্বর প্রান্তিকে নগদ আদায় জোরদার করার প্রভাবে খেলাপি ঋণে এই উন্নতি হয়েছে। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য অনেক খেলাপি প্রার্থী তাদের বকেয়া ঋণ নিয়মিত করেন। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, খেলাপি ঋণ কমার এই চিত্র পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। কারণ যেটা কমেছে তার বড় অংশ এসেছে পুনঃতফসিল, হিসাব সমন্বয় ও অবলোপনের মাধ্যমে; যার অধিকাংশ সুবিধাভোগী বড় গ্রাহকরাই।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, বিগত সময়ে বড় গ্রাহকদের খেলাপি ঋণের তথ্যই বেশি লুকানো হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কঠোর নজরদারিতে সেটি বেরিয়ে এসেছে। ফলে সার্বিক খাতেই খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। এটা কমাতে নগদ আদায়ে জোর দিতে হবে। সেই সঙ্গে ঋণ বিকেন্দ্রীকরণ তথা ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মাঝে বিতরণ বাড়াতে হবে। এ ছাড়া ঋণের নামে যারা লুটপাট করেছে, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
তথ্য অনুযায়ী, ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণে খেলাপি হার গত সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ৫১ শতাংশে উঠেছিল। ঢালাও পুনঃতফসিলের কারণে তাদের ঋণ ডিসেম্বর প্রান্তিকে কমে দাঁড়িয়েছে ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ৩২ হাজার ২৩ কোটি টাকা। গত তিন মাসে তাদের ঋণ কমেছে প্রায় ৩৯ হাজার ৯৩ কোটি টাকা। যদিও গত এক বছরের ব্যবধানে বড়দের খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৮৩ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বড়দের ঋণে খেলাপির হার ছিল ৩০ দশমিক ৪০ শতাংশ। ৪০ কোটি ১ টাকা থেকে ৫০ কোটি টাকার ঋণের গ্রাহকদের (মাঝারি গ্রাহক) খেলাপি ঋণের হার আরও বেশি, প্রায় ৪৩ শতাংশ।
তিন মাস আগে তাদের খেলাপির হার ছিল ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশ। আর এক বছর আগে ছিল ১৯ দশমিক ১ শতাংশ; আর ১০ কোটি ১ টাকা থেকে ৪০ কোটি টাকার ঋণ গ্রাহকদের খেলাপির হার ৩৫ থেকে ৪৪ শতাংশ। তিন মাস আগে তাদের খেলাপির হার ছিল ৪৪ থেকে ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ বড় ও মাঝারি ঋণেই সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হয়েছে। ছোট ঋণও এই চাপ থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। কারণ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপি হার এখন ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে এ হার কম হলেও তা আন্তর্জাতিক স্টান্ডার্ডের তুলনায় বেশি। তিন মাস আগে তাদের হার ছিল আরও বেশি প্রায় ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। তবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ছোটদের ঋণে খেলাপির হার ১০ শতাংশের নিচে ছিল।
বিগত আওয়ামী লীগ আমলে বড় ঋণগ্রহীতাদের নানা সুবিধা দেওয়া হয়। তাদের ঋণ পুনঃতফসিল করা হয় বারবার, এমনকি নতুন ঋণ দিয়ে পুরনো ঋণ ঢেকে দেওয়া হয়। ফলে খেলাপি ঋণ লুকানো অবস্থায় ছিল। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর অবস্থানে সেই লুকানো খেলাপি ঋণ বেরিয়ে আসে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঋণ শ্রেণিকরণের নীতিমালা কঠোর করা হয়েছে। ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়তে থাকে এবং গত সেপ্টেম্বরে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। ওই সময় পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে হয়েছিল প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা বা ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, বড় ঋণে খেলাপি হওয়ার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, প্রভাবশালী গ্রাহকদের প্রতি অতিরিক্ত ছাড়, ঋণের অর্থ অন্য খাতে সরিয়ে ফেলা এবং তদারকির ঘাটতি অন্যতম। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের প্রকৃত সক্ষমতা যাচাই না করেই এবং পর্যাপ্ত জামানত ছাড়া ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ছোট ঋণগ্রহীতার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। ব্যাংকগুলো তাদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কঠোর নিয়ম অনুসরণ করে এবং নিয়মিত তদারকি চালায়। ফলে ছোট উদ্যোক্তারা ঋণ পরিশোধে বেশি শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকেন এবং খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে।

