ঢাকা
logo
প্রকাশিত : November 3, 2026

মধুখালীতে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, হারপিক পানের ৪৩ দিন পর কিশোরীর মৃত্যু

শাহজাহান হেলাল, মধুখালী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি: ফরিদপুরের মধুখালীতে স্কুলে যাওয়ার পথে কিশোরীকে তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। লোকলজ্জার ভয়ে ওই কিশোরী হারপিক খেয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেন। ঘটনার প্রায় দেড় মাস পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিজ বাড়ীতে মারা গেছে ওই কিশোরী। মৃত্যুর আগে এক ভিডিওতে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে অভিযুক্তদের নাম প্রকাশ করে গেছেন ঐ কিশোরী, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

মিথিলা আক্তার ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার আড়পাড়া ইউনিয়নের রাজধরপুর গ্রামের আ. হান্নান কানের মেয়ে। সে আড়পাড়া কাজী সিরাজুল ইসলাম স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। ২৬ অক্টোবর দিবাগত রাত ১টার দিকে নিজ বাড়িতেই মৃত্যু হয় মিথিলার। এ ঘটনায় থানা পুলিশের দ্বারস্ত হলেও মামলা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ পরিবারের।

সতেরো বছরের কিশোরী মিথিলা আক্তার। পারিবারিক সিদ্ধান্তে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের কাবিনও হয়েছিল। ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬খ্রি.সোমবার স্কুলে যাওয়ার পথে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের রাজধরপুর এলাকায় তাকে জোরপূর্বক তুলে নেয় ৪ যুবক। এরপর নির্জন গড়াউ নদীর তীরে মাটিকাটা এলাকায় নিয়ে করা হয় সংঘবদ্ধ ধর্ষণ। এমন পাশবিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তাৎক্ষণিক আত্মহননের চেষ্টা করেন। পরে প্রায় দেড়মাস পর মৃত্যুর কাছে হার মানতে হয়েছে তাকে। মেয়ের এমন মৃত্যুতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বাবা হান্নান শেখ এবং অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী মা জেসমিন খাতুন।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সোমবার ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬খ্রি. সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে স্কুলে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছিল মিথিলা। স্কুলে যাওয়ার পথে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে পৌঁছালে মোটরসাইকেলে এসে পার্শ্ববর্তী মাগুরা জেলার নাকোল গ্রামের রাফি শেখ (২১), রায়নগর গ্রামের রাহুল শেখ (২০), সায়মন বিশ্বাস (২০) জোরপূর্বকভাবে তাকে তুলে নিয়ে যায়। পরিবারের সদস্যরা এমন খবর পেয়ে দ্রুত ছুটে গেলেও খুঁজে পায়নি তাদের।

এরপর মাগুরার শ্রীপুর থানাধীন নাকোল গ্রামের গড়াই নদীর নির্জন স্থান মাটিকাটা ঘাট নামক এলাকায় নিয়ে তিন যুবক ধর্ষণ করেন কিশোরীকে। সহযোগিতা করে সোহাগ শেখ (২০) নামের আরেক যুবক। একপর্যায়ে তাদের হাত থেকে ছুটে গিয়ে মধুমতি নদীতে ঝাপ দেয় মিথিলা। তাৎক্ষণিক স্থানীয় বাসিন্দারা ৯৯৯ এর মাধ্যমে পুলিশকে ফোন দেন এবং ঘটনাস্থলে এসে মিথিলাকে উদ্ধার করে নাকোল পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর পরিবারের সদস্যরা খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান।

অভিমানে পুলিশ ফাঁড়ির বাথরুমে গিয়ে সেখানে থাকা বিষাক্ত হারপিক পান করে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে কিশোরী। তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের সহযোগিতায় মাগুরা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং পরদিন উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে ১১ দিন চিকিৎসা শেষে বাড়িতে নিয়ে যায় পরিবারের সদস্যরা। এরপর থেকে শারীরিক নানা জটিলতা নিয়ে বাড়িতে রেখেই চিকিৎসা চলছিল তার। এতে কঙ্কালসারে পরিণত হয় তার শরীর। ২৬ অক্টোবর দিবাগত রাত একটার দিকে নিজ বাড়িতেই মারা যায় মিথিলা। খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে। পরে ময়না তদন্ত শেষে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনায় থানা পুলিশের দ্বারস্ত হলেও মামলা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ পরিবারের।

এদিকে মৃত্যুর আগে এক ভিডিওতে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে গেছেন ওই কিশোরী, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে বলতে শোনা যায়, তাকে মোটরসাইকেলে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায় সোহাগ শেখ, রাফি শেখ, রাহুল শেখ, সায়মন বিশ্বাস।

সরেজমিনে রবিবার (১ নভেম্বর) বিকালে মিথিলাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকে স্তব্ধ হয়ে আছে পরিবারের সদস্যরা। মেয়ের এমন মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন বাবা হান্নান শেখ এবং অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী মা জেসমিন খাতুনও। প্রতিবেশীরা বাড়িতে ভিড় করছে।

কোথাও বিচার না পেয়ে সাংবাদিকদের দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মিথিলার মা জেসমিন খাতুন। তিনি বলেন, ‘আমরা কম ঘুরি নাই। একটা সন্তান যহন হারায় যায় তারা কি বইস্যা থাহে? কিন্তু এই পুলিশ-দারোগা, যারা অপরাধী তাঁগের (তাঁদের) শাস্তি দেয় না, দুই থানাতে কেস নিলো না ক্যাম্মায়ে (কেমনে)? কেস নেবে না কেন বলেন? আপনি যে অপরাধী, আপনার শাস্তি নাই? যার মৃত্যু অয়ে গ্যাছে- কেস (মামলা) না নিয়ে তাগের বাড়ি পাঠায় দেয় ক্যাম্মায়ে মিথিলার মা জেসমিন খাতুনের ভাষ্যমতে, এ ঘটনার পর পরিবারের সদস্যদের থানায় ডেকে নেন মধুখালী থানা পুলিশ। পরে তাদের শ্রীপুর থানায় পাঠানো হয়। সেখানে মামলা না নিয়ে জোরপূর্বক একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর রেখে তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, ‘শ্রীপুর থানায় গেলে ওসি মেলা লিখিত নেয় এবং একটা কাগজে সই রাইখ্যা দেয়। আর ওসি বলল, কেস ময়নাতদন্তের পর অবে, এহন অবিনা (হবে না)। মনে অচ্ছে উনি (ওসি) প্রাইভেট পড়াচ্ছে। তখন থানায় সোহাগ ও রাফির পরিবারের লোকজনও ছিল। পরে মামলা না নিয়ে আমাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। এরপর থেকে কোনো থানায়ই মামলা নিচ্ছে না। আমার মাইয়্যাডাকে এভাবে মাইর‍্যা ফেলছে, বিচারডা কি কোথাও পাব না।’

মিথিলার ভগ্নিপতি বিল্পব শেখ অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার শ্যালিকাকে তুলে নেয়ার তিন মাস আগে অন্য জায়গা কাবিন হয়েছিল। এতে ওর মামাতো ভাই ক্ষিপ্ত হয়, কারণ সে বিয়ে করতে চেয়েছিল। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী রাফির সাথে যোগাযোগ করে এই ঘটনা ঘটায়।’

তিনি আরও বলেন, মিথিলা সুস্থ হওয়ার পর ঘটনাটি আমাদের জানিয়েছিল। এরপর ওর ভবিষ্যতের স্বার্থে বা নতুন বিয়ে হওয়ায় আমরাও কোথাও জানায়নি। কিন্তু মিথিলা এসব মেনে নিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত চলে গেল। আমরা এই চারজনের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।

মিথিলার বাবা হান্নান শেখ বলেন, সরকারের কাছে দাবি আমার মেয়ের মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া হোক। আমার মেয়ের হত্যাকারীদের বিচার চাই।’

শ্রীপুর থানা পুলিশের বক্তব্য, রাফি শেখের সাথে প্রেমের সম্পর্ক ছিল মিথিলার। এর মধ্যে মিথিলার অন্যত্র বিয়ে হয়। এর জের ধরে ১৪ সেপ্টেম্বর মধুমতি নদীর মাটিকাটা ঘাট এলাকায় দুজনে দীর্ঘ সময় গল্প করে এবং নদীতে ঝাপ দেয়। যা ঘাটে থাকা রফিকুল মাঝি দেখতে পেয়ে স্থানীয়দের জানায়। পরে স্থানীয় ফাঁড়ির পুলিশ উদ্ধার করে নিয়ে যায় এবং এক পর্যায়ে বাথরুমে গিয়ে হারপিক খেয়েছিল মিথিলা।

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওলি মিয়া বলেন, এ ঘটনায় আমরা একটি তদন্ত প্রতিবেদন করেছি। তদন্তে ওই ঘাট এলাকায় ধর্ষণের শিকার হয়েছে এমন আলামত পাওয়া যায়নি। কারণ, ঘাটটির আশপাশে ঝোপঝাড় নেই এবং ফাঁকা। তাছাড়া সেখানে মানুষের যাতায়াত এবং সার্বক্ষণিক মাঝি থাকে। তারা কেউ এ ধরনের দৃশ্য দেখেনি। তবে অন্য কোথাও ধর্ষণ করেছে কি-না সেটা আমার জানা নেই।

তিনি আরও বলেন, ‘মেয়েটিকে যখন উদ্ধার করা হয় তখন ধর্ষণের কথা জানায়নি। এমনকি দেড়মাসেও কেউ জানায়নি। তার মৃত্যুর পর একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে পরিবার, যা রহস্যজনক। খবর পেয়ে তার পরিবারের সদস্যরা ফাঁড়িতে আসলে অভিভাবকদের জিম্মায় দেয়া হয়। এসময় ফাঁড়ির বাথরুমে গিয়ে হারপিক খায় কিশোরী। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। তবে ধর্ষণের বিষয়টি পুলিশকে জানায়নি ওই কিশোরী।’
তিনি আরো জানান, যেহেতু চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার বাড়ি মধুখালীতে মারা গেছে, সে কারণে মধুখালী থানা ব্যবস্থা নিবে।

এ বিষয়ে মধুখালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সুকদেব রায় বলেন, ঘটনাটি জানার পর শ্রীপুর থানায় যোগাযোগ করি এবং থানার ওসি পরিবারকে পাঠিয়ে দিতে বলে। এরপর তারা শ্রীপুরে গেলে একটি অপমৃত্যুর মামলা নেয়া হয়। পরবর্তীতে জানতে পেরেছি মেয়েটি ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। কিন্তু দেড়মাস আগের ঘটনাটি আমাদেরকে কেউ জানায়নি। ২ নভেম্বর ২০২৬খ্রি. সোমবার মিথিলার বাবা আ.হান্নান খান ৪ জনকে আসামী করে একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত সাপেক্ষে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram