

মো: নাজমুল হোসেন ইমন, চট্টগ্রাম: রাত পৌনে ১১টা। চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড়ে মোটরসাইকেল থামিয়ে মোবাইল ফোনের পর্দায় চোখ রাখেন মিরাজ হাসান। কখন আসবে নতুন রাইডের অনুরোধ, সেই অপেক্ষায় তিনি। একটি অনুরোধ এলেই শুরু হবে আরেকটি যাত্রা। আর যাত্রী না পেলে দিনের আয়ও থেমে যাবে।
মিরাজ নগরীর একটি কলেজে স্নাতকোত্তরে পড়ছেন। পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব সামলাতে পড়াশোনার পাশাপাশি বেছে নিয়েছেন রাইডশেয়ারিং। তাঁর কোনো নিয়োগপত্র নেই, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই, মাস শেষে নিশ্চিত বেতনও নেই। নেই প্রচলিত অর্থে কোনো নিয়োগকর্তা। কাজের সুযোগ তৈরি করে দেয় একটি ডিজিটাল অ্যাপ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করা মো. লোকমানের পথ অবশ্য ভিন্ন। ২০২৪ সালেই তিনি বুঝতে পারেন, প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি পেতে সময় লাগতে পারে। অপেক্ষায় না থেকে নিজেকে গড়ে তোলেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে। ধীরে ধীরে তৈরি করেন নিজের কাজের ক্ষেত্র। এখন তাঁর মাসিক আয় চাকরিজীবী অনেক সহপাঠীর আয়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো।
মিরাজ ও লোকমানের কাজের ধরন আলাদা। একজন মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় ঘোরেন, অন্যজন কাজ করেন ডিজিটাল জগতে। কিন্তু দুজনের বাস্তবতায় মিল রয়েছে—কাজ আছে, আয় আছে, অথচ প্রচলিত অর্থে নিয়োগকর্তা নেই।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে এমন কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে। কেউ রাইডশেয়ারিং করছেন, কেউ খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন, কেউ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হয়ে অনলাইনে কাজ করছেন। কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি, অনলাইন ব্যবসা কিংবা ডিজিটাল সেবা দিয়ে আয় করছেন।
কাজ, প্রকল্প বা অর্ডার অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাওয়ার এই কর্মব্যবস্থার নাম ‘গিগ অর্থনীতি’। প্রযুক্তির বিস্তার এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এটি হয়ে উঠছে কর্মসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
তবে এই অর্থনীতির সামনে এখন দুটি বড় প্রশ্ন—কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ কতটা বিস্তৃত হচ্ছে, আর সেই সুযোগ তৈরি করতে গিয়ে কর্মীরা কতটা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ছেন?
কর্মসংস্থানের নতুন বাস্তবতা
গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ। তাঁদের মধ্যে কর্মসংস্থান হয়েছে ৮৭ লাখের। এই পরিসংখ্যান শ্রমবাজারে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির চ্যালেঞ্জকে সামনে আনে। তবে বাকি তরুণদের সবাই যে বেকার, তা নয়। তাঁদের কেউ স্বনিয়োজিত হয়েছেন, কেউ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন, আবার কেউ গিগ অর্থনীতির মাধ্যমে আয়ের পথ খুঁজে নিয়েছেন।
গিগ অর্থনীতিতে ঠিক কতজন কাজ করছেন, তার পূর্ণাঙ্গ ও হালনাগাদ সরকারি হিসাব নেই। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ও অনলাইন মার্কেটপ্লেসের তথ্য থেকে এ খাতের ব্যাপ্তি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এসব সূত্রের সমন্বিত হিসাবে গিগ অর্থনীতিতে যুক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখ থেকে সাড়ে ৩৭ লাখ বলে উল্লেখ করা হয়। তবে এই হিসাবের মধ্যে নিবন্ধিত, সক্রিয় ও খণ্ডকালীন কর্মীদের কতজন রয়েছেন, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর নিজস্ব হিসাবেও কর্মসংস্থানের বড় চিত্র উঠে আসে।
উবার ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে তাদের প্ল্যাটফর্মে ২১ লাখ ৪০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তবে প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত চালক ও চালকের সহায়তায় যুক্ত ব্যক্তিদের সবাই যে নিয়মিত কাজ করেন কিংবা শুধু উবারের আয়ের ওপর নির্ভরশীল, এমন নয়। ফলে নিবন্ধিত কর্মীর সংখ্যা দিয়ে প্রকৃত সক্রিয় কর্মীর সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না।
পাঠাওয়ের বাইক, কার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, খাবার সরবরাহ ও কুরিয়ার সেবায় প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার কর্মী যুক্ত রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ফুডপান্ডায় নিবন্ধিত রাইডারের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ।
অন্যদিকে, ফ্রিল্যান্সিং বাংলাদেশের গিগ অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সক্রিয় কর্মীর সংখ্যা সাড়ে ছয় লাখের মতো বলে উল্লেখ করা হয়।
তবে একই ব্যক্তি একাধিক প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত থাকতে পারেন। কেউ চাকরির পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং করেন, কেউ আবার অবসর সময়ে রাইডশেয়ারিং থেকে বাড়তি আয় করেন। ফলে এসব পরিসংখ্যান সরাসরি যোগ করে গিগ অর্থনীতিতে কর্মরত মানুষের মোট সংখ্যা নির্ধারণ করলে দ্বৈত গণনার ঝুঁকি থাকে।
বিশ্বব্যাংক ও অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের গবেষণায় বৈশ্বিক অনলাইন শ্রমবাজারে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অবস্থানের কথা উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট গবেষণার একটি হিসাবে বৈশ্বিক অনলাইন শ্রমের ১৬ শতাংশ বাংলাদেশের কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই হিসাবের সংজ্ঞা, সময়কাল ও গবেষণাপদ্ধতি যাচাই করে তবেই বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত।
আয় বাড়লেও অনিশ্চয়তা কাটেনি
গিগ অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, প্রচলিত চাকরির বাইরে থেকেও আয়ের সুযোগ তৈরি করা যায়। নির্দিষ্ট অফিস, স্থায়ী নিয়োগপত্র কিংবা পূর্ণকালীন চাকরি ছাড়াও একজন ব্যক্তি নিজের দক্ষতা ও সময় অনুযায়ী কাজ করতে পারেন। কিন্তু এই স্বাধীনতার বিপরীতে রয়েছে অনিশ্চয়তা।
একজন রাইডার যত বেশি যাত্রা সম্পন্ন করবেন, সাধারণত তাঁর আয়ের সুযোগ তত বাড়বে। একজন ফ্রিল্যান্সার যত বেশি প্রকল্প পাবেন, তত বেশি অর্থ উপার্জন করতে পারবেন। কিন্তু কাজ না থাকলে আয়ও কমে যায়। অসুস্থতা, দুর্ঘটনা কিংবা ব্যক্তিগত জরুরি পরিস্থিতিতে কাজ বন্ধ রাখতে হলে অনেকেরই বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা থাকে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। তাঁদের সবার জন্য পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। এ বাস্তবতায় গিগ অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে তাঁর মতে, এ খাতের কর্মীদের বড় অংশ চুক্তিভিত্তিক বা অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় কাজ করেন। ফলে তাঁদের অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, কৃষিকাজ, রিকশা চালানো কিংবা ছোট ব্যবসার তুলনায় গিগ অর্থনীতির কিছু ক্ষেত্রে বেশি আয়ের সুযোগ রয়েছে। উচ্চশিক্ষিত কোনো তরুণ চাকরি না পেয়ে মোটরসাইকেল চালানো বা খাবার সরবরাহের কাজ বেছে নিলে সেটিকে শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি কর্মসংস্থানের নতুন একটি ক্ষেত্র।
তবে আয়ের সুযোগ তৈরি হওয়া আর মানসম্মত কর্মসংস্থান নিশ্চিত হওয়া এক বিষয় নয়। গিগ অর্থনীতি বেকারত্বের চাপ কমাতে সহায়তা করলেও কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
দুর্ঘটনা ঘটলে দায় নেবে কে?
মিরাজের মতো একজন রাইডারের কর্মজীবনে দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে প্রতিদিন। সড়কে দুর্ঘটনায় আহত হলে চিকিৎসার ব্যয় কে বহন করবে? কয়েক দিন কাজ করতে না পারলে পরিবারের খরচ চলবে কীভাবে? বয়স বাড়লে কিংবা কর্মক্ষমতা কমে গেলে তাঁর আয়ের বিকল্প কী থাকবে?
একই প্রশ্ন ফ্রিল্যান্সারদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাজ করতে গিয়ে পারিশ্রমিক আটকে গেলে অভিযোগ জানাবেন কোথায়? কোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হঠাৎ অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিলে কাজের সুযোগ ফিরে পাওয়ার ব্যবস্থা কী? আয়ের প্রমাণ না থাকায় ব্যাংকঋণ বা অন্যান্য আর্থিক সেবা পেতে সমস্যা হলে সমাধান কী?
প্রচলিত চাকরির ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা, শ্রম আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালার মাধ্যমে কর্মীদের জন্য কিছু সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু গিগ অর্থনীতির কর্মীরা অনেক সময় সেই কাঠামোর বাইরে থাকেন। তাঁদের সঙ্গে প্ল্যাটফর্মের সম্পর্ক কর্মসংস্থান, সেবাদান নাকি স্বাধীন চুক্তিভিত্তিক কাজ—এই শ্রেণিবিন্যাসও অধিকার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রহমান তরফদার বলেন, গিগ অর্থনীতিতে যুক্ত অনেকের বাংলাদেশে সরাসরি কোনো নিয়োগকর্তা নেই। কেউ বাংলাদেশে বসে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানের কাজ করছেন। তাই এসব কর্মীর অধিকার ও কাজের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে উপযুক্ত নীতিমালা প্রয়োজন।
তিনি জানান, গিগ কর্মীদের একটি কাঠামোর আওতায় আনার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ক্ষেত্রে শুধু শ্রমিকের সংজ্ঞা নির্ধারণ করলেই হবে না। প্ল্যাটফর্মের দায়িত্ব, দুর্ঘটনা বিমা, অভিযোগ নিষ্পত্তি, পারিশ্রমিকের স্বচ্ছতা এবং কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষার বিষয়গুলোও নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।
দেশের মধ্যেই আছে সুরক্ষার নজির
গিগ কর্মীদের সুরক্ষার জন্য সব সমাধান যে একেবারে নতুন করে তৈরি করতে হবে, তা নয়। দেশের কয়েকটি প্ল্যাটফর্ম ইতিমধ্যে সীমিত পরিসরে এমন কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, যেগুলো থেকে নীতিনির্ধারকেরা ধারণা নিতে পারেন।
ফুডপান্ডার ‘প্যান্ডাহার্টস’ কর্মসূচি এর একটি উদাহরণ। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে সক্রিয় থাকা রাইডারদের ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা বিমার আওতায় আনা হয়। সপ্তাহে অন্তত একটি ডেলিভারি সম্পন্ন করলেই একজন রাইডার এ সুবিধা পেতে পারেন। বিমার ব্যয় বহন করে প্রতিষ্ঠানটি।
ফুডপান্ডার হেড অব পাবলিক অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস জাহেদুল ইসলাম জানান, কর্মঘণ্টার বাইরেও বড় দুর্ঘটনা ঘটলে এই বিমার সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া রাইডারদের জন্য ছাড়মূল্যে চিকিৎসা, বিনা মূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও টেলিমেডিসিন সেবার ব্যবস্থাও রয়েছে।
এ উদ্যোগ দেখায়, প্ল্যাটফর্মকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কিছু ব্যবস্থা বেসরকারি পর্যায়েই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তবে একটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কর্মসূচি আর পুরো খাতের জন্য বাধ্যতামূলক সুরক্ষা এক নয়। বিমার আওতা, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ, শর্ত এবং দাবি নিষ্পত্তির পদ্ধতি সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনা বিমার পাশাপাশি কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, জরুরি সহায়তা, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা এবং আয়ের ধারাবাহিকতা রক্ষার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
গিগ কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। দেশটি গিগ অর্থনীতির কর্মীদের সুরক্ষায় পৃথক আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত মালয়েশিয়ার ‘গিগ ওয়ার্কার্স অ্যাক্ট ২০২৫’-এর আওতায় কর্মীদের অধিকার, প্ল্যাটফর্মের দায়িত্ব এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কর্মী ও প্ল্যাটফর্মের আর্থিক অবদানের মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা তহবিল গড়ে তোলার ধারণাটিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
এ ধরনের ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো, কর্মীর আয় অনিয়মিত হলেও যেন তাঁর সামাজিক সুরক্ষা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে না যায়। তবে আইনের কার্যকর হওয়ার তারিখ, সুনির্দিষ্ট বিধান, চাঁদার হার এবং সুবিধা পাওয়ার শর্ত মূল আইনি নথি থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য এ অভিজ্ঞতার তাৎপর্য রয়েছে। কারণ, এখানেও অনেক কর্মী একাধিক প্ল্যাটফর্মে কাজ করেন। কেউ সপ্তাহে কয়েক দিন রাইডশেয়ারিং করেন, আবার কেউ অনলাইনে বিদেশি গ্রাহকের কাজ করেন। ফলে প্রচলিত একক নিয়োগকর্তাভিত্তিক ব্যবস্থায় তাঁদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন।
বাংলাদেশে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে কর্মী, প্ল্যাটফর্ম ও সরকারের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে তা বাস্তবায়নের আগে কর্মীদের আয়ের সক্ষমতা, প্ল্যাটফর্মের পরিচালন ব্যয়, প্রশাসনিক কাঠামো এবং বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চ্যালেঞ্জ
গিগ অর্থনীতির আরেকটি বড় ক্ষেত্র ফ্রিল্যান্সিং। বাংলাদেশের বহু তরুণ ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসে গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ডেটা এন্ট্রি, অনুবাদ, কনটেন্ট লেখা ও বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর সেবা দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছেন।
কিন্তু এই খাতেও পরিবর্তন আসছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতির ফলে কিছু সাধারণ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ দ্রুত স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাচ্ছে। এতে বিশেষ করে কম দক্ষতানির্ভর কাজের ওপর নির্ভরশীল ফ্রিল্যান্সারদের প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে।
বিডিজবস ডটকমের প্রধান নির্বাহী একেএম ফাহিম মাশরুর মনে করেন, গিগ অর্থনীতি বেকারত্বের চাপ কিছুটা কমাতে সাহায্য করছে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ফ্রিল্যান্সারদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ডেটা এন্ট্রি, সাধারণ অনুবাদ ও প্রাথমিক পর্যায়ের কনটেন্ট লেখার মতো কাজগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে শুধু কর্মসংস্থানের সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। কর্মীদের দক্ষতা এমন পর্যায়ে নিতে হবে, যাতে তাঁরা প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার পাশাপাশি প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়েও আয় বাড়াতে পারেন।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা জানান, ফ্রিল্যান্সার ও প্ল্যাটফর্মকর্মীদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানো সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল উদ্যোক্তা তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কন্টাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের (বাক্কো) সভাপতি তানভীর ইব্রাহিমের মতে, এ খাতকে টেকসই করতে দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মীদের আর্থিক সেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের গিগ অর্থনীতিতে টিকে থাকতে ডিজিটাল দক্ষতা, ভাষাগত সক্ষমতা, সমস্যা সমাধান, প্রযুক্তি ব্যবহারের জ্ঞান এবং বিশেষায়িত পেশাগত দক্ষতার বিকল্প নেই।
বিনিয়োগ বাড়ছে, নীতিমালা কতটা প্রস্তুত?
বাংলাদেশের গিগ অর্থনীতি শুধু ব্যক্তিগত আয়ের ক্ষেত্র নয়; এটি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও নতুন ব্যবসা তৈরিরও একটি সম্ভাবনাময় বাজার।
বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ট্র্যাক্সনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের গিগ অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সংখ্যা ছিল ২৯২টি। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এ খাতে বিনিয়োগ এসেছে ৮ কোটি ৫৭ লাখ মার্কিন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিভিন্ন সূত্রে বাংলাদেশের গিগ অর্থনীতির বার্ষিক বাজারমূল্য ১০০ কোটি থেকে ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার বলে অনুমান করা হয়। তবে এই হিসাবের আওতায় কোন কোন সেবা, ব্যবসা ও লেনদেন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তা যাচাই করা জরুরি। কারণ, ফ্রিল্যান্সিং, রাইডশেয়ারিং, ই-কমার্স ও অনলাইন ডেলিভারির বাজারের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যের বরাত দিয়ে দেশে তরুণদের সামগ্রিক বেকারত্বের হার ১২ থেকে ১৩ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। তবে বেকারত্বের হার নির্ধারণে বয়সসীমা, সময়কাল ও পরিসংখ্যানের সংজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ। তাই এসব তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের নির্দিষ্ট হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।
সামগ্রিকভাবে এসব প্রবণতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে—ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর কাজের বাজার বিস্তৃত হচ্ছে। কিন্তু সেই বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্রম অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা কতটা এগোচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
বাংলাদেশের সামনে কী করণীয়?
গিগ অর্থনীতিকে টেকসই করতে হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি কর্মীদের অধিকার সুরক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রথমত, কর্মীদের সঠিক পরিসংখ্যান তৈরি করতে হবে। কতজন নিবন্ধিত, কতজন সক্রিয় এবং কতজন গিগ কাজের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছেন, তা আলাদাভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। এতে নীতিনির্ধারণ ও বাজেট পরিকল্পনা সহজ হবে।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক সুরক্ষার কাঠামো গড়তে হবে। দুর্ঘটনা বিমা, স্বাস্থ্যসেবা, জরুরি সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের সুযোগ তৈরিতে সরকার, প্ল্যাটফর্ম ও কর্মীদের অংশগ্রহণের উপযোগী ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পারিশ্রমিক নির্ধারণের পদ্ধতি, কমিশন, অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার কারণ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির নিয়ম স্বচ্ছ হওয়া দরকার। কর্মীদের যেন অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর কার্যকর সুযোগ থাকে।
চতুর্থত, দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফটওয়্যার, ডিজিটাল বিপণন, উন্নত গ্রাফিক ডিজাইন ও বিশেষায়িত অনলাইন সেবায় প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
পঞ্চমত, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত বেতন না থাকলেও কর্মীরা যেন বৈধ আয়ের প্রমাণ দেখিয়ে ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয়, ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক সেবা পেতে পারেন, সে ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।
এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের শ্রমবাজার, আয়ের ধরন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিমালা তৈরি করা যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি নিরাপত্তার
রাত আরও বাড়ে। জিইসি মোড়ে অপেক্ষারত মিরাজের মোবাইল ফোনে নতুন রাইডের অনুরোধ আসে। তিনি হেলমেট পরেন, মোটরসাইকেল চালু করেন। যাত্রীর গন্তব্যে পৌঁছে দিতে আবার রাস্তায় নামেন।
মিরাজের মতো তরুণেরা নিজেদের উদ্যোগে কাজের সুযোগ তৈরি করছেন। লোকমানের মতো অনেকে প্রচলিত চাকরির বাইরে নিজস্ব দক্ষতাকে আয়ের উৎসে পরিণত করছেন। তাঁদের এই উদ্যোগ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
কিন্তু কর্মসংস্থানের নতুন এই বাস্তবতায় একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—কাজের সুযোগ তৈরি হলে সেই কাজের সঙ্গে নিরাপত্তাও কি নিশ্চিত হবে?
গিগ অর্থনীতির কর্মীরা শুধু কাজের সুযোগ চান না; তাঁরা চান ন্যায্য পারিশ্রমিক, দুর্ঘটনায় সুরক্ষা, অসুস্থতায় সহায়তা এবং ভবিষ্যতের আর্থিক নিশ্চয়তা।
বাংলাদেশের সামনে তাই চ্যালেঞ্জ শুধু আরও কর্মসংস্থান তৈরি করা নয়। বরং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে নিয়োগকর্তা না থাকলেও কর্মীকে অধিকারহীন থাকতে হবে না।
কাজ আছে, আয় আছে—এবার দরকার সেই কাজের চারপাশে একটি কার্যকর নিরাপত্তাবেষ্টনী।
