

শহিদ জয়, যশোর: যশোরের ৯৩টি ইউনিয়ন ও আটটি পৌরসভায় সার ডিলার নিয়োগে চরম দলীয়করণ, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনের বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, প্রকৃত ব্যবসায়ী ও কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যোগ্য ব্যক্তিদের বঞ্চিত করে রাজনৈতিক পরিচয় এবং অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে অনেককে সার ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। এমনকি একাধিক ফৌজদারি মামলার আসামি, মাদক কারবারে আটকের ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তির স্ত্রী এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মীও ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন তাঁরা। এ পরিস্থিতিতে বিতর্কিত নিয়োগ বাতিল, অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত এবং সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করে সৎ ও যোগ্য ব্যবসায়ীদের ডিলার নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন পাঁচ সংসদ সদস্য।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টায় প্রেসক্লাব যশোরে এক সংবাদ সম্মেলনে পাঁচ সংসদ সদস্যের পক্ষে লিখিত বক্তব্যে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন যশোর জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির ও যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম রছুল।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, যশোরের ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে পাঁচটিতে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য থাকা সত্ত্বেও সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁদের পরামর্শ ও সুপারিশ যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। অভিযোগ অনুযায়ী, জেলা প্রশাসক সরকারদলীয় ব্যক্তিদের দেওয়া তালিকা চূড়ান্ত করে কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে প্রার্থীদের সততা, দক্ষতা, পেশাদারিত্ব এবং কৃষির সঙ্গে তাঁদের বাস্তব সম্পৃক্ততার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন সংসদ সদস্যরা।
তাঁদের অভিযোগ, সার ডিলার নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে কৃষি উপকরণের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রকৃত ব্যবসায়ী এবং কৃষকদের সেবা দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে—এমন ব্যক্তিরা বঞ্চিত হয়েছেন। অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের মাধ্যমে অযোগ্য বা বিতর্কিত ব্যক্তিদের ডিলারশিপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক গোলাম রছুল কয়েকজন ডিলারের নাম উল্লেখ করে তাঁদের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তিনি অভিযোগ করেন, বাঘারপাড়া উপজেলার বাসুয়ারী ইউনিয়নের হাবিবুর ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী হাবিবুর রহমানকে সার ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক, ব্যাংক ডাকাতি ও প্রতারণাসংক্রান্ত মামলা রয়েছে বলে দাবি করেন এই সংসদ সদস্য। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এমন অভিযোগ ও মামলার বিষয় থাকা সত্ত্বেও একজন ব্যক্তিকে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এ ছাড়া মনিরামপুর পৌরসভায় নাফিজ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মাসুদ পারভেজ রুবেলকে ডিলারশিপ দেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন অধ্যাপক গোলাম রছুল। তিনি দাবি করেন, মাসুদ পারভেজ রুবেল উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির ছেলে। একই সঙ্গে মনিরামপুর উপজেলার শ্যামকুড় ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট সালাউদ্দীনের ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি।
সংসদ সদস্যের এসব বক্তব্যের মাধ্যমে সার ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক সম্পর্ক এবং প্রার্থীদের অতীত কর্মকাণ্ড যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, সে প্রশ্ন সামনে এসেছে। তবে সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ডিলার, প্রশাসন কিংবা কৃষি বিভাগের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও নিয়োগপ্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে শুধু ডিলার নিয়োগ নয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি গঠন নিয়েও আপত্তি জানান সংসদ সদস্যরা।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, এসব কমিটিতে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কৃষক, ব্যবসায়ী ও সামাজিক প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের পরামর্শ ও সুপারিশ গ্রহণ না করেই কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
সংসদ সদস্যদের দাবি, কৃষি খাতের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ব্যক্তি ও প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিবর্তে জেলা ও উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীদের কমিটিতে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মতে, সার ও বীজের সরবরাহ, বিতরণ, বাজার পরিস্থিতি এবং কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় এসব কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনার পরিবর্তে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ, অভিজ্ঞতা এবং সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
তাঁরা আরও বলেন, সার ডিলার নিয়োগ ও মনিটরিং কমিটি গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না হলে কৃষি উপকরণ বিতরণব্যবস্থায় অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে প্রকৃত কৃষক ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন,সার কৃষি উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। সময়মতো এবং ন্যায্যমূল্যে কৃষকদের কাছে সার পৌঁছে দেওয়া খাদ্য উৎপাদন ও কৃষি ব্যবস্থাপনার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এ কারণে সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, সততা, অভিজ্ঞতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তাঁদের অভিযোগ, নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা ও অনিয়ম প্রাধান্য পেলে কৃষকদের প্রকৃত সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে কৃষি উপকরণের সুষ্ঠু বিতরণব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তাই নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ, প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি বলে মনে করেন তাঁরা।
বক্তারা বলেন, সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও দলীয়করণের অভিযোগের কারণে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।
সংবাদ সম্মেলনে পাঁচ সংসদ সদস্যের পক্ষে অধ্যাপক গোলাম রছুল বর্তমান সার ডিলার নিয়োগপ্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, যেসব নিয়োগের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ডিলারশিপ বাতিল করে সরকারি বিধিবিধান অনুযায়ী যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে হবে।
তাঁরা আরও দাবি করেন, সার ডিলার নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশের পরিবর্তে নির্ধারিত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং কৃষক, ব্যবসায়ী ও সামাজিক প্রতিনিধিদের যথাযথ অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সার ডিলার নিয়োগে কথিত দলীয়করণ ও দুর্নীতির অভিযোগের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। বক্তারা বলেন, কৃষি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা পক্ষপাতিত্ব গ্রহণযোগ্য নয়। তাই অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রকৃত, সৎ ও যোগ্য ব্যবসায়ীদের ডিলারশিপ নিশ্চিত করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন যশোর-১ (শার্শা) আসনের সংসদ সদস্য আজিজুর রহমান, যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনের সংসদ সদস্য মোসলেম উদ্দিন ফরিদ, যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনের সংসদ সদস্য মোক্তার আলী, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবু জাফর, সহসেক্রেটারি গোলাম কুদ্দুস, যশোর জেলা প্রচার সেক্রেটারি অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন বিশ্বাসসহ দলীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
