ঢাকা
logo
প্রকাশিত : October 20, 2026

বাগেরহাটে মাদকে আসক্ত কিশোরের মৃত্যু, মাদক বিক্রেতার বাড়িতে এলাকাবাসীর অভিযান

বাগেরহাট প্রতিনিধি: বাগেরহাট সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের রহিমাবাদ গ্রামে(১৬) বছর বয়সী স্কুলছাত্র কাজী মারজানের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে মাদকের সহজলভ্যতা নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।

পরিবারের দাবি, মাদক কেনার জন্য চাহিদামতো টাকা না পেয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল মারজান। বিষপানের পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনার পর এলাকায় মাদকবিরোধী তৎপরতায় নামেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মাদক বিক্রির অভিযোগ ওঠা একটি বাড়িতে গিয়ে তারা ঘর সরানোর উদ্যোগ নেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তাদের উপস্থিতির খবর পেয়ে ওই বাড়ির এক ব্যক্তি সেখান থেকে চলে যান বলেও দাবি করেছেন তারা।

মারজান রহিমাবাদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, সে আসন্ন এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। তার বাবা কাজী এনামুল হক রিপন অনেক আগেই মারা গেছেন। পরিবারে রয়েছে তার এক ছোট বোন। স্বামীহারা মায়ের সংসারে আর্থিক সংকটের মধ্যেই বেড়ে উঠছিল মেধাবী এই কিশোর।

পরিবারের সদস্যদের জানান, মারজান গত দুই থেকে তিন বছর ধরে মাদকাসক্ত ছিল। মাদক কেনার জন্য সে বিভিন্ন সময়ে পরিবারের কাছে টাকা চাইত। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় তার চাহিদামতো টাকা দেওয়া সম্ভব হতো না। টাকা না পেলে সে মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়ত এবং বিভিন্ন ধরনের আচরণ করত বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।

পরিবার ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাত আনুমানিক সাড়ে সাতটার দিকে বিষপান করে মারজান। পরে স্বজনেরা তাকে উদ্ধার করে বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাত সাড়ে তিনটার দিকে মৃত্যু হয়।

মারজানের মৃত্যুর পর রহিমাবাদ গ্রামে মাদকের বিস্তার ও সহজলভ্যতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদক কেনাবেচা চলছে। বিশেষ করে রহিমাবাদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের আশপাশে মাদক বিক্রির অভিযোগ তুলে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, মাদক সহজে পাওয়া যাওয়ায় এলাকার তরুণদের একটি অংশ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শেখ হাসানুল বান্না বলেন, রহিমাবাদ একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সুস্থ পরিবেশ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মাদকের বিস্তার নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। এলাকায় মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করা ব্যক্তিদের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে অনুরোধ করা হলেও কার্যকর পরিবর্তন দেখা যায়নি।

আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড সভাপতি ছিলেন শেখ আবু সাঈদ। তার মেজো ভাই হাফিজুর রহমান আওয়ামী লীগের শাসনামলেও তাঁদের মামার প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় মাদক বিক্রি ও জমি দখল করেছেন বলে আমাদের অভিযোগ। এখনো সেই প্রভাব খাটিয়ে রহিমাবাদ এলাকায় মাদক ব্যবসা চালানো হচ্ছে বলে আমরা মনে করি। স্কুলের পাশে একটি ঘর তুলে সেখানে বসে মাদক বিক্রি করা হয়। এ ছাড়া রাস্তার পাশে গরুর গোয়াল তৈরি করে পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে এবং মসজিদের জমি দখল করে পানবরজ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তাদের ভয়ে এলাকার মানুষ অনেক সময় মুখ খুলতে পারেন না। আমরা প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাই, আমাদের ভাইপোকে আর ফিরে পাব না। কিন্তু মাদকের কারণে আর কোনো পরিবারের সন্তান যেন এভাবে প্রাণ না হারায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা সরকারের কাছে রহিমাবাদকে মাদকমুক্ত করার দাবি জানাচ্ছি।

আজ আমরা এলাকাবাসী একত্রিত হয়ে অভিযোগ ওঠা বাড়িটি উচ্ছেদের উদ্যোগ নিতে এসেছিলাম। কিন্তু আমাদের উপস্থিতির খবর পেয়ে তাঁরা সেখান থেকে চলে যান।

স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল খান বলেন, মারজানের পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল ছিল। মাদক কেনার জন্য সে যে পরিমাণ টাকা চাইত, তা পরিবারের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব হতো না। তাঁর দাবি, টাকা না পেলে মারজান অস্বাভাবিক আচরণ করত।

তিনি আরও বলেন, রহিমাবাদ গ্রামের গাবতলা থেকে ভাঙ্গড় এলাকা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে মাদক কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা রয়েছেন যারা আওয়ামী লীগ আমলেও তারা দলের নাম ভাঙ্গিয়ে চলছে এখনো তারা এই আমলে এসেও তারা সেভাবেই মাদকের ব্যবসা করে যাচ্ছে। তাদের উপরে কথা বলার মতন এই গ্রামে কারো সাহস নাই আমরা সরকারের কাছে প্রধানমন্ত্রীর কাছে হাতজোড় করে অনুরোধ জানাচ্ছি যে আমাদের একটু মাদকমুক্ত সমাজ চাই।

স্থানীয় বাসিন্দা মিলন বলেন, মারজান এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। তার সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ছিল। মাদকের সহজলভ্যতা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা চাই, আমাদের গ্রাম আগের মতো সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশে ফিরে আসুক। মাদকের বিরুদ্ধে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

এলাকায় প্রভাবশালী একটি চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় মাদক কেনাবেচা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে তার এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি। অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের বক্তব্যও এ প্রতিবেদনে পাওয়া সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা বেগ মোকাররম হোসেন বলেন, রহিমাবাদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে মাদক কেনাবেচার বিষয়ে তারা একাধিকবার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনুরোধ করেছেন। পরে তিনি বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও বাগেরহাট সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছেও বিষয়টি তুলে ধরেন বলে দাবি করেন। তাঁর মতে, কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে এলাকার তরুণদের মাদকের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতো। মারজানের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি রহিমাবাদ গ্রামকে মাদকমুক্ত করতে প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ দাবি করেন।

তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও পুলিশের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মাদক বিক্রির অভিযোগ এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাইও প্রয়োজন।

মারজানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা একত্রিত হয়ে মাদকবিরোধী অবস্থান নেন। স্থানীয়দের দাবি, তাঁরা মাদক বিক্রির অভিযোগ ওঠা একটি বাড়িতে গিয়ে ঘর সরানোর উদ্যোগ নেন। তাঁদের উপস্থিতির খবর পেয়ে ওই বাড়ির এক ব্যক্তি চলে যান বলেও তাঁরা জানান।

এ ঘটনায় আইনগতভাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, তারা এলাকায় মাদক কেনাবেচা বন্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে চান। পাশাপাশি তরুণদের খেলাধুলা ও সুস্থ সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার সমাদ্দার বলেন, গতকাল রাতে বিষপানের কারণে এক অল্পবয়সী ছেলেকে আমাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাকে বাঁচানোর জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। তবে অতিরিক্ত মাত্রায় বিষপানের কারণে শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। রাত আনুমানিক সাড়ে তিনটার দিকে তার মৃত্যু হয়। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে পুলিশ এসে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। ময়নাতদন্ত-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহটি তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বাগেরহাট সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ সামসুল আরেফিন বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে পাঠিয়েছে। এ ঘটনায় থানায় একটি মামলা রুজু করা হয়েছে।

এক কিশোরের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পরিবার ও এলাকাজুড়ে। একই সঙ্গে মাদকের সহজলভ্যতা, তরুণদের আসক্তি এবং তা প্রতিরোধে সামাজিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, মারজানের মৃত্যুর ঘটনা যথাযথভাবে তদন্ত করা হবে এবং মাদক কেনাবেচার অভিযোগগুলো যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram