

হুমায়ুন কবীর রিন্টু, নড়াইল প্রতিনিধি: নড়াইলে বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী পালিত হয়েছে। সোমবার (১০ আগষ্ট) দিবসটি পালন উপলক্ষে নড়াইলের এসএম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা, জেলা প্রশাসন, জেলা শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করে।
কর্মসূচির মধ্যে ছিল এসএম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালায় সকাল ৬টায় কোরান খতম, সকাল ৯টায় শিল্পীর মাজারে শ্রদ্ধাঞ্জলি ও দোয়া মাহফিল, সকাল সাড়ে ৯টায় শিশু কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনী উদ্বোধন, সকাল ১০টায় আর্ট ক্যাম্প উদ্বোধন, আলোচনা অনুষ্ঠান ও সম্মাননা পদক প্রদান।
এসএম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালার সভাপতি ও জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ আবদুল ছালাম এর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চু, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন।
প্রসঙ্গত, ১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট শিল্পী এস এম সুলতান (লাল মিয়া) নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে বাবা রাজমিস্ত্রি মেছের আলীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব বয়স থেকেই সুলতানের চিত্রাঙ্কনের প্রতিভা দেখা যায়। অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালে লাল মিয়া নড়াইলের তৎকালীন জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায়ের সু-দৃষ্টিতে পড়েন। তিনি সুলতানকে কলকাতায় নিয়ে খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ ও শিল্প-সমালোচক এবং কলকাতা আর্ট স্কুলের গভর্নিং বডির সদস্য অধ্যাপক সায়েদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। একাডেমিক যোগ্যতা বিচার না করেই ১৯৪১ সালে বিশেষ বিবেচনায় অষ্টম শ্রেণি পাস সুলতানকে কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি করা হয়। ১৯৪৪ সালে কলেজের তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান দখল করে চতুর্থ বর্ষে উত্তীর্ণ হন মেধাবী সুলতান।
ছাত্রাবস্থায় দুরন্ত সুলতান কলেজ ছেড়ে কাশ্মীরের পাহাড়ি অঞ্চলে উপজাতিদের সঙ্গে বসবাস ও তাদের জীবন-জীবিকা নিয়ে চিত্রাঙ্কন শুরু করেন। পরে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফরে বেরিয়ে পড়েন। শিল্পী সুলতান যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ সফর করেন এবং এসব দেশে প্রখ্যাত চিত্রকরদের সঙ্গে তার ছবি প্রদর্শিত হয়। ১৯৫৫-৫৬ সালের দিকে শিল্পী মাটির টানে জন্মভূমিতে ফিরে আসেন, ওই সময় তিনি নিজস্ব উদ্যোগে নিজ বাড়ি নড়াইলের মাছিমদিয়ায় ফাইন আর্ট স্কুল ও ‘শিশুস্বর্গ’ নামে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। শিশু-কিশোর প্রেমী সুলতান ১৯৮০ সালে নিজ বাড়িতে শিশুস্বর্গের অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শুরু করেন। এছাড়া তিনি ১৯৯২ সালে ৬০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৫ ফুট প্রস্থের ‘ভ্রাম্যমাণ শিশুস্বর্গ’ নামে দ্বিতল নৌকা নির্মাণ করেন। এই নৌকায় তিনি শিশুদের নিয়ে চিত্রা নদীতে ভ্রমণ করতেন এবং নৌকায় বসেই তাদের চিত্রাঙ্কন শেখাতেন।
সুলতানের শিল্পকর্মের বিষয়বস্তু ছিল বাংলার কৃষক, জেলে,তাঁতি, কামার, কুমার, মাঠ, নদী, হাওর, বাঁওড়, পাল, জঙ্গল, সবুজ প্রান্তর ইত্যাদি। শিল্পী সুলতানের ছবি ভারতের সিমলা, পাকিস্তানের লাহোর ও করাচি, যুক্তরাষ্ট্রে নিউইয়র্ক, বোস্টন, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্যের লন্ডন এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, ঢাকায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একাধিক বার প্রদর্শিত হয়। চিত্রাঙ্কনের পাশাপাশি এস এম সুলতান বাঁশি বাজাতেন। এছাড়াও তিনি নিজ বাড়িতে সাপ, বেজি, বানর, খরগোশ, মদনটাক, ময়না, গিনিপিক, মুনিয়া, ষাঁড়সহ বিভিন্ন পশু-পাখি পুষতেন। তিনি বাড়িতে একটি মিনি চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদক পান। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্ট আর্টিস্ট এবং ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সম্মাননা পদক পান। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর চিরকুমার এই শিল্পী দীর্ঘদিন শ্বাসকষ্টে ভোগার পর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নড়াইলের নিজ বাড়ির আঙিনায় তাকে সমাহিত করা হয়।
