

মো: নাজমুল হোসেন ইমন: ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশনের মাধ্যমে মাত্র ১৩টি ক্লিকে ২৮ দিনের মধ্যে নামজারি নিষ্পত্তির যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, নির্ধারিত ১৩ ধাপ পেরিয়েও অনেক আবেদন শেষ পর্যন্ত অনুমোদনের মুখ দেখে না। সার্ভারের ধীরগতি, সফটওয়্যারের ত্রুটি এবং প্রযুক্তিগত জটিলতায় প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সাধারণ সেবাগ্রহীতারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একটি নামজারি আবেদন নিষ্পত্তির জন্য অ্যাসিল্যান্ডকে ধারাবাহিকভাবে ১৩টি ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। আবেদন গ্রহণ, দলিল ও খতিয়ান যাচাই, ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরীক্ষা, নোটিশ ও শুনানি, আপত্তি নিষ্পত্তি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতামত, চূড়ান্ত অনুমোদনসহ প্রতিটি ধাপ সফটওয়্যারের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তবে বাস্তবে শেষ ধাপেই সবচেয়ে বেশি জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে।
প্রক্রিয়ার শুরুতে নাগরিকের অনলাইন আবেদন অ্যাসিল্যান্ডের কাছে পৌঁছায়। সেখান থেকে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে তদন্তের জন্য পাঠানো হয়। তদন্ত প্রতিবেদন ও কানুনগোর মতামত পাওয়ার পর আবেদনটি আবার অ্যাসিল্যান্ডের কাছে ফিরে আসে। এরপর শুনানি শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার কথা থাকলেও প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে অনেক আবেদন মাঝপথেই আটকে যাচ্ছে।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, চূড়ান্ত অনুমোদনের সময় অনেক ক্ষেত্রে দাগের জমির তথ্যের অসামঞ্জস্য, খতিয়ানে তথ্যগত ভুল কিংবা সার্ভারের ত্রুটির কারণে পুরো আবেদন পুনরায় শুরু করতে হচ্ছে। অনেক সময় ক্লিক করার পরও কোনো কমান্ড কাজ করে না, আবার কখনো প্রয়োজনীয় অপশনই প্রদর্শিত হয় না। ফলে একই আবেদন একাধিকবার সম্পন্ন করতে হচ্ছে।
একাধিক সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সার্ভারের সমস্যা এখন প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। একটি ধাপ শেষ করে পরবর্তী ধাপে গেলেই আবেদন আবার প্রথম ধাপে ফিরে আসে। এতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাদের ভাষ্য, স্বাভাবিকভাবে কয়েক মিনিটে শেষ হওয়ার মতো কাজও সার্ভারের ধীরগতির কারণে অনেক বেশি সময় নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অফিসের ইন্টারনেট সংযোগ ব্যাহত হওয়ায় মোবাইল ডেটা ব্যবহার করে কাজ চালাতে হচ্ছে, যা সেবা প্রদানে আরও বিলম্ব সৃষ্টি করছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে বর্তমানে ৪ লাখ ২৮ হাজার ৯৮০টি নামজারি আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮৫ হাজার আবেদন ২৮ দিনের নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করেছে। বর্তমানে নামজারি আবেদনের গড় অনুমোদনের হার প্রায় ৬৬ শতাংশ।
ভূমি ব্যবস্থাপনা সহজ, দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে চালু হওয়া ডিজিটাল নামজারি ব্যবস্থা এখনও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সফটওয়্যারের ত্রুটি দূর করে সার্ভারের সক্ষমতা বাড়ানো এবং তথ্য যাচাই প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করা গেলে সেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে।
চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও এলাকার বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “নামজারির আবেদন করার পর নির্ধারিত সময় পার হলেও কোনো অগ্রগতি পাচ্ছি না। অনলাইনে আবেদন করলেও শেষ পর্যন্ত বারবার ভূমি অফিসে যেতে হচ্ছে। ডিজিটাল সেবা থেকে যে সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে তা পাচ্ছি না।”
আনোয়ারা উপজেলার বাসিন্দা নাছিমা আক্তার বলেন, “আবেদনের অবস্থা জানতে গিয়ে বারবার একই উত্তর পাচ্ছি—সার্ভারের সমস্যা। এতে সময় ও অর্থ দুটোই নষ্ট হচ্ছে।”
চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ভূমি অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সার্ভারের ধীরগতি ও সফটওয়্যারজনিত সমস্যার কারণে আবেদন নিষ্পত্তিতে বিলম্বের অভিযোগ নতুন নয়। সেবাগ্রহীতারা দ্রুত সমস্যার সমাধান করে প্রতিশ্রুত ২৮ দিনের মধ্যে নামজারি সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন।
