

নুরুল ইসলাম আসাদ, উজিরপুর (বরিশাল) প্রতিনিধি: প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো আজ সোমবার (১৩ জুলাই) বরিশাল সফরে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার এ সফরকে কেন্দ্র করে বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মাঝেও দেখা দিয়েছে ব্যাপক উৎসাহ, উদ্দীপনা ও প্রত্যাশা। দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন-সংশ্লিষ্ট দাবিগুলোর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসতে পারে, এমন আশা লালন করে আসছে এ অঞ্চলের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সরকারপ্রধান হিসেবে দক্ষিণাঞ্চলে এটি তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর হওয়ায় সফরটিকে রাজনৈতিক ও উন্নয়ন উভয় দিক থেকেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
সফরসূচি অনুযায়ী, সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রী গৌরনদী উপজেলার বাটাজোরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এরপর বরিশাল নগরীর বেলস পার্ক সংলগ্ন এলাকায় আরেকটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। দুপুরে বরিশাল শিল্পকলা একাডেমিতে জেলা ও মহানগর বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় ও সাংগঠনিক সভায় যোগ দেন। এছাড়া দেশের সার্বিক পরিস্থিতি এবং ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশার কেন্দ্রে রয়েছে দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো। এর মধ্যে ঢাকা-বরিশাল ছয় লেন মহাসড়ক নির্মাণ, বরিশালে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) স্থাপন, ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণ এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবিগুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এসব বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ঘোষণা বা বাস্তবায়নের রূপরেখা আসবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ ও সচেতন নাগরিকদের মতে, এসব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। একই সঙ্গে কৃষি, মৎস্য ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্য দ্রুত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন সহজ হবে। দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বৈষম্য অনেকাংশে দূর হবে বলেও তাদের প্রত্যাশা।
সফরকে ঘিরে প্রশাসনিক প্রস্তুতি ছিল চোখে পড়ার মত। গতকাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত প্রস্তুতি সভায় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এম জহির উদ্দিন স্বপন, বরিশালের বিভিন্ন সংসদীয় আসনের সদস্য, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতারা অংশ নেন। সভায় প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, জনসমাগম ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা সেবা এবং সার্বিক সমন্বয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
এদিকে বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনেও প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংসদ সদস্য এস. সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টুর নেতৃত্বে উজিরপুর ও বানারীপাড়ায় সফরকে সফল করতে বিভিন্ন প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে স্বাগত মিছিল, আনন্দ মিছিল, গণসংযোগ এবং প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন দলীয় নেতাকর্মীরা। তাদের প্রত্যাশা, এই সফরের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের পাশাপাশি বরিশাল-২ আসনের উন্নয়নেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

এরই ধারাবাহিকতায় আজ সকাল থেকেই হাজার হাজার বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের জনসমুদ্র নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে স্বাগত ও অভিনন্দন জানান। এসময় উপস্থিত ছিলেন উজিরপুর উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি এসএম আলাউদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন খান, পৌর বিএনপির সভাপতি শহিদুল ইসলাম খান, সাধারণ সম্পাদক রোকনুজ্জামান টুলু, উপজেলা যুবদলের সভাপতি আফম সামসুদ্দোহা আজাদ, সাধারণ সম্পাদক মনির মল্লিক, স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক মাহাবুব গোমস্তা, সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক সৈয়দ মোঃ ইউছুফ, উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি জিয়া আমিন রাঢ়ী, সাধারণ সম্পাদক সাহাদুৎ জামান কমরেড, সাবেক সভাপতি সোলাইমান খান হাইউম, আতিকুল ইসলাম বিপ্লব, উপজেলা মহিলা দলের সভানেত্রী ইয়াসমিন আক্তার পারুল, সাধারণ সম্পাদিকা শিরিন বেগম, উপজেলা ছাত্র দলের ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক তারেক সুজন, পৌর মহিলা দলের সভানেত্রী মাকসুদা আক্তার শিল্পী, সাধারণ সম্পাদিকা মনিরা আক্তার শিখাসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মীরা সফরকে সফল করতে মাঠে সক্রিয় সক্রিয় ছিলেন।
এছাড়াও কেন্দ্রীয় বিএনপির বন ও পরিবেশ বিষয়ক সহ-সাধারণ সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম টিপু ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য মোঃ দুলাল হোসেন এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোঃ সাইফ মাহমুদ জুয়েল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উষ্ণ স্বাগত জানাতে উজিরপুর ইচলাদী হাইওয়েতে সকল নেতাকর্মীদের সাথে কুশল বিনিময় করে বরিশালের পথে রওয়ানা দেন।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে স্বাগত জানিয়ে বরিশাল নগরীসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দল, ছাত্রদল এবং অন্যান্য অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে আনন্দ মিছিল, প্রচার কর্মসূচি ও গণসংযোগ করেছে। দলীয় কার্যালয়গুলোতে বিরাজমান ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এইচ এম তসলিম উদ্দিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন উপজেলায় স্বাগত কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় বিএনপির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান আক্তার শিরিন বলেন, বরিশালবাসী প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত ছিল। তার মতে, এ সফর শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের ক্ষেত্র তৈরি করবে ইনশাআল্লাহ। জনগণের দীর্ঘদিনের দাবিগুলো বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী ইতিবাচক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, নেতাকর্মী এবং সাধারণ জনগণের মতে, সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম বরিশাল সফর রাজনৈতিক ও উন্নয়ন উভয় ক্ষেত্রেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের বহু প্রতীক্ষিত অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোর বিষয়ে যদি সুস্পষ্ট ঘোষণা বা বাস্তবায়নের রোডম্যাপ আসে, তবে তা বরিশাল বিভাগের সামগ্রিক অর্থনীতি, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন গতি সঞ্চার করবে। তাই এই সফরকে ঘিরে পুরো দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে বিরাজমান ছিল উৎসবের আমেজ, উচ্ছ্বাস এবং নতুন সম্ভাবনার প্রত্যাশা।
