

আবু হেনা সাকিল, রাবি প্রতিনিধি: মেসে মিলের হিসাবের গরমিল, বোর্ডারদের অভিযোগ, মাস শেষে হিসাব মেলানোর চাপ আর প্রতিদিনের ঝামেলার বাস্তব অভিজ্ঞতাই এক শিক্ষার্থীর কাছে হয়ে ওঠে প্রযুক্তিনির্ভর একটি স্টার্টআপের অনুপ্রেরণা। দীর্ঘ কয়েক বছরের চেষ্টা, ব্যর্থতা ও নিরলস পরিশ্রমের পর সেই ভাবনাকে ‘মুঠোমেস’ নামে একটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বাস্তব রূপ দিয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মতিউর রহমান মিজান।
শুক্রবার (১০ জুলাই) আনুষ্ঠানিকভাবে তারা মুঠোমেস অ্যাপটিকে গুগল প্লে স্টোরে রিলিজ দেন।
মতিউর রহমান জানান, ২০২২ সালে রংপুর সরকারি সিটি কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হওয়ার পর তার মেস জীবনের শুরু। অল্প সময়ের মধ্যেই মিল ম্যানেজারের দায়িত্ব নিতে হয়। মেসের নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব না নিলে ১ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা দিতে হতো। বাধ্য হয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পরই তিনি বুঝতে পারেন, মিল ম্যানেজারি শুধু হিসাব রাখার কাজ নয়, বরং প্রতিনিয়ত চাপ ও দুশ্চিন্তার একটি দায়িত্ব।
তিনি বলেন, সব হিসাব খাতায় সংরক্ষণ করার পরও এক মাস শেষে নিজের পকেট থেকে ৩০ টাকা যোগ করতে হয়েছিল। টাকার অঙ্ক নয়, বরং হিসাব কোথায় গরমিল হলো সেটিই তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছিল।
তার মতে, একজন মিল ম্যানেজারকে প্রতিদিন বোর্ডারদের মিল চালু বা বন্ধ করা, জমা টাকা যাচাই, পর্যাপ্ত ব্যালেন্স নিশ্চিত করা, অতিথিদের মিলের ব্যবস্থা করা এবং মাস শেষে সবার আলাদা হিসাব তৈরি করতে হয়। অন্যদিকে সাধারণ বোর্ডারদেরও প্রতিটি ছোট কাজের জন্য বারবার মিল ম্যানেজারের কাছে যেতে হয়। এসব কারণে অধিকাংশ মেসেই কেউ স্বেচ্ছায় মিল ম্যানেজারের দায়িত্ব নিতে চান না।
এই সমস্যার সমাধান খুঁজতেই প্রথমে বাজারে থাকা বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে দেখেন তিনি। তবে কোনোটি তার প্রয়োজন পূরণ করতে পারেনি। এরপর নিজেই ‘মুঠোমেস’ নামে একটি ওয়েবভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নেন। কয়েকবার কাজ শুরু করেও নানা সীমাবদ্ধতায় মাঝপথে থেমে যেতে হয়। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আবার মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট শুরু করেন। সর্বশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সিনিয়র শিক্ষার্থীর সঙ্গে অংশীদারিত্বে প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে এগিয়ে নেন।
মতিউর রহমান বলেন, ‘মুঠোমেস’ শুধু মিলের হিসাব রাখার অ্যাপ নয়। এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে মেস পরিচালনার প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কাজ এক জায়গা থেকেই সম্পন্ন করা যাবে। প্রাথমিক সংস্করণে মিল ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও ভবিষ্যতে আরও বিভিন্ন সেবা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্টার্টআপটি তৈরির পেছনের সংগ্রামের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দিনের পর দিন রাত চারটা-পাঁচটা পর্যন্ত কাজ করেছেন। কখনো ফজরের নামাজ পড়ে কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে আবার সকালে ক্লাসে গিয়েছেন। পরীক্ষা, অসুস্থতা, মোবাইল নষ্ট হয়ে যাওয়া কিংবা অন্যান্য প্রযুক্তিগত সমস্যাও তাকে থামাতে পারেনি।
তিনি জানান, অ্যাপ তৈরির চেয়ে সেটি প্রকাশের প্রক্রিয়াই ছিল সবচেয়ে কঠিন। গুগল প্লে স্টোরে প্রকাশ, সার্ভার ও ডোমেইন কেনা, বিভিন্ন প্রযুক্তিগত শর্ত পূরণ এবং প্রয়োজনীয় ফি পরিশোধ করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় ও উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হয়েছে।
মতিউর রহমানের মতে, শুরুতে একজন সিনিয়র ভাই তাকে আর্থিক সহায়তা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন। পরিবারের সদস্যরা সব সময় তার ওপর আস্থা রেখেছেন। পাশাপাশি বন্ধু, শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষামূলকভাবে অ্যাপটি ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় মতামত দিয়েছেন, যা উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মুঠোমেস’-কে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে চান তারা। এর পাশাপাশি আগে স্থগিত হয়ে যাওয়া একটি এডটেক প্রকল্পও পুনরায় চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তাদের লক্ষ্য এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যেখানে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সেবাগুলো একই জায়গা থেকে পাওয়া যাবে।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এখন পর্যন্ত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পাননি বলে জানান এই তরুণ উদ্যোক্তা। তবে প্ল্যাটফর্মটি দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে বড় পরিসরের বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার বিশ্বাস, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ পেলে ‘মুঠোমেস’ শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর ও টেকসই একটি প্রযুক্তি উদ্যোগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।
