

স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, ওষুধ, জ্বালানি ও শিল্প উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে ভারতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের নাম অনেকের অজানা।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচারের চেয়ে উৎপাদন, প্রযুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে তারা এমন অবস্থানে পৌঁছেছে যেখানে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাদের ওপর নির্ভরশীল।
ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া বর্তমানে উৎপাদনের পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। প্রতি বছর প্রতিষ্ঠানটি ১৫০ কোটিরও বেশি ডোজ টিকা উৎপাদন করে। গত কয়েক দশকে বিশ্বের অসংখ্য শিশু পোলিও, ডিপথেরিয়া, হেপাটাইটিস বি, হামসহ বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে যে টিকা পেয়েছে, তার বড় অংশ এ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত।
১৯৬৬ সালে সাইরাস পুনাওয়ালা পুণেতে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। শুরুতে ঘোড়ার রক্ত থেকে অ্যান্টিটক্সিন উৎপাদনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের অন্যতম প্রধান টিকা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। কোভিড-১৯ মহামারির আগে বৈশ্বিক টিকাদান কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল এ প্রতিষ্ঠান।
কৃষিযন্ত্র উৎপাদনেও ভারতের অবস্থান শক্তিশালী।
মহিন্দ্রা অ্যান্ড মহিন্দ্রা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের সর্বাধিক ট্র্যাক্টর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। শুধু ভারত নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিষ্ঠানটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ইউটিলিটি ট্র্যাক্টর বাজারে সহজ রক্ষণাবেক্ষণ, নির্ভরযোগ্যতা ও তুলনামূলক কম খরচের কারণে মহিন্দ্রা উল্লেখযোগ্য গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। জটিল প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রের পরিবর্তে ব্যবহারবান্ধব ট্র্যাক্টর সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি অনেক কৃষকের আস্থা অর্জন করেছে।
ভারতের ড. রেড্ডিজ ল্যাবরেটরিজ আন্তর্জাতিক ওষুধ বাজারে জেনেরিক ওষুধের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কোম্পানি উচ্চমূল্যের পেটেন্ট ওষুধের বিকল্প হিসেবে আইনসম্মত উপায়ে একই কার্যকারিতার জেনেরিক ওষুধ বাজারে আনার উদ্যোগ নেয়।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিভিন্ন ওষুধের পেটেন্টকে আইনি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কম দামে ওষুধ সরবরাহের পথ খুলে দেয়। এর ফলে বহু রোগীর চিকিৎসা ব্যয় কমে আসে এবং জেনেরিক ওষুধের বাজার সম্প্রসারিত হয়।
জ্বালানি খাতেও ভারতের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের জামনগর রিফাইনারি। গুজরাটে অবস্থিত এ স্থাপনাটি বিশ্বের বৃহত্তম একক-সাইট পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি হিসেবে পরিচিত।
প্রতিদিন ১২ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে এর। জটিল ও উচ্চ সালফারযুক্ত অপরিশোধিত তেলও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর করতে সক্ষম এ রিফাইনারি। একই সঙ্গে শিল্পায়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও পরিচালনা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
১৯৭৮ সালে কিরণ মজুমদার-শ প্রতিষ্ঠিত বায়োকন শুরু হয়েছিল একটি ছোট গ্যারেজ থেকে। সীমিত মূলধন নিয়ে শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বায়োটেকনোলজি ও বায়োফার্মাসিউটিক্যাল খাতের অন্যতম পরিচিত নাম।
ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও অটোইমিউন রোগের জন্য ব্যবহৃত জটিল বায়োলজিক্যাল ওষুধ তুলনামূলক কম দামে উৎপাদনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববাজারে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এতে উন্নয়নশীল দেশের অসংখ্য রোগীর জন্য ব্যয়বহুল চিকিৎসা তুলনামূলক সহজলভ্য হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, জ্বালানি ও ওষুধশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে ভারতের এসব প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তাদের অবদান উল্লেখযোগ্য হলেও প্রচার তুলনামূলক কম। তবে উৎপাদন সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা বৈশ্বিক শিল্প ও অর্থনীতিতে নিজেদের প্রভাব দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
