

পুঠিয়া (রাজশাহী) প্রতিনিধি: কাগজে-কলমে মেয়াদ ছিল মাত্র তিন মাস। বাস্তবে সেই আহ্বায়ক কমিটিই পার করে ফেলেছে প্রায় ছয় বছর। অথচ এখনও অধরা পূর্ণাঙ্গ কমিটি। রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক বাস্তবতায় এই দীর্ঘসূত্রতা ঘিরে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ, প্রশ্ন এবং অনিশ্চয়তা। দলের তৃণমূলের একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন কাউন্সিল না হওয়ায় নেতৃত্বের বিকাশ থমকে গিয়েছে, নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড। উপজেলা থেকে ইউনিয়ন, এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়েও দলের কার্যক্রমে নেমে এসেছে স্থবিরতা।
দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২৩ অক্টোবর পুঠিয়া উপজেলা বিএনপির ৫৩ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। ওই কমিটিতে আবু বকর সিদ্দিককে আহ্বায়ক, আবু হায়াৎকে যুগ্ম আহ্বায়ক এবং এনতাজুল হক বাবুকে সদস্যসচিব করা হয়। বিএনপির সাংগঠনিক বিধি অনুযায়ী, আহ্বায়ক কমিটি সাধারণত ৯০ দিনের জন্য গঠিত হয়। ওই সময়ের মধ্যেই কাউন্সিল আয়োজন করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের কথা। কিন্তু পুঠিয়ায় সেই সময়সীমা বহু আগেই পেরিয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি আজও আলোর মুখ দেখেনি।
পুঠিয়া উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মধ্যে কেবল পৌরসভা ছাড়া অন্য কোনো ইউনিয়নে সম্মেলন হয়নি বলে অভিযোগ। ফলে নতুন নেতৃত্ব তৈরির সাংগঠনিক প্রক্রিয়াও কার্যত থমকে রয়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের একাংশের দাবি, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, লবিং-গ্রুপিং, আত্মীয়প্রীতি, ব্যক্তিস্বার্থ এবং নেতৃত্বের নিষ্ক্রিয়তার জেরেই এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হয়েছে।
দলের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অন্তর্বর্তী কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল থাকায় সংগঠনের প্রাণশক্তি কমেছে। কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর কার্যক্রমেও তার প্রভাব পড়েছে। অনেকেই এখন দ্রুত কাউন্সিল আয়োজন করে নির্বাচিত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার দাবি তুলছেন।
পুঠিয়া উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আলহাজ আনোয়ারুল ইসলাম জুম্মার অভিযোগ, বর্তমান আহ্বায়ক কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। তাঁর কথায়, “রাতের আঁধারে এই কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তিন মাসের জন্য গঠিত কমিটি ছয় বছরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে পারেনি। এতে সংগঠন ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বদলে বিভক্ত হয়েছে। এখন একমাত্র সমাধান—কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন।”
একই দাবি তুলেছেন পুঠিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনছুর রহমান মাস্টার। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান কমিটি উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে পারেনি। তাঁর আরও দাবি, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কমিটির শীর্ষ দুই নেতা ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীর পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করেননি। তাই বর্তমান কমিটি বিলুপ্ত করে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের আহ্বান জানান তিনি।
তবে অভিযোগগুলির বিষয়ে বক্তব্য জানতে পুঠিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু বকর সিদ্দিকের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনে দীর্ঘদিন আহ্বায়ক কমিটি বহাল থাকা সাংগঠনিক স্থবিরতার ইঙ্গিত বহন করে। নিয়মিত কাউন্সিল, জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব নির্বাচন এবং তৃণমূলের অংশগ্রহণই একটি সংগঠনের প্রাণশক্তি। পুঠিয়া উপজেলা বিএনপির ক্ষেত্রেও সেই প্রশ্ন এখন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে—তিন মাসের জন্য গঠিত কমিটির যাত্রা ছয় বছর পেরোলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটির অপেক্ষা আর কত দিন?
