ঢাকা
২৮শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ৯:৩২
logo
প্রকাশিত : জুন ২৮, ২০২৬

তীব্র গরমে সাটুরিয়ায় লোডশেডিংয়ের দুর্ভোগ, বিপর্যস্ত জনজীবন

মাহমুদুল হাসান, সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি: দুপুরের সূর্য যেন আগুন ঝরাচ্ছে, সন্ধ্যা নামলেও কমছে না গরমের তীব্রতা। মানুষ যখন একটু স্বস্তির আশায় বৈদ্যুতিক পাখার সুইচে হাত রাখছেন, ঠিক তখনই চলে যাচ্ছে বিদ্যুৎ। মুহূর্তেই থেমে যাচ্ছে পাখার ঘূর্ণন, ভারী হয়ে উঠছে ঘরের বাতাস। এরপর শুরু হয় অপেক্ষা, কখন ফিরবে বিদ্যুৎ। সেই অপেক্ষারও নেই কোনো নির্দিষ্ট সময়। কখনো আধা ঘণ্টা, কখনো এক-দুই ঘণ্টা, আবার কখনো তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। দিনের পর দিন এমন অনিশ্চয়তায় কাটছে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার মানুষের জীবন। তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন ও দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিংয়ে নাজেহাল হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিকাজ, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক দিন ধরে লোডশেডিংয়ের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কোথাও দিনে-রাতে ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা, আবার কোথাও ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। উপজেলা সদরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকায় গ্রাহকেরা জানেন না কখন বিদ্যুৎ যাবে, আবার কখন আসবে। ফলে প্রতিটি দিন কাটছে অনিশ্চয়তার মধ্যে।

বিশেষ করে রাতে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। প্রচণ্ড গরমে অনেকেই ঘরের বাইরে উঠান, বারান্দা কিংবা রাস্তার পাশে বসে সময় কাটাচ্ছেন। অনেক পরিবার রাতভর কয়েক দফা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার কারণে ঠিকমতো ঘুমাতেই পারছে না। বিদ্যুৎ এলেও কিছুক্ষণ পর আবার চলে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে বিরক্তি ও ক্ষোভ বাড়ছে।

সাটুরিয়া এলাকার বাসিন্দা মো. মিজানুর রহমান বলেন, "একবার বিদ্যুৎ গেলে কখন আসবে, তার কোনো ঠিক থাকে না। বিশেষ করে রাতে পাঁচ-ছয়বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ যায়। গরমে ঘুমানো যায় না। ছোট শিশু আর বয়স্ক মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে। বিদ্যুতের এই অবস্থা আর সহ্য করা যাচ্ছে না।"

লোডশেডিংয়ের সরাসরি প্রভাব পড়ছে উপজেলার বিদ্যুৎনির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সেবা খাতে। চার্জ না হওয়ায় হ্যালোবাইক চালকেরা নিয়মিত যানবাহন চালাতে পারছেন না। ধান ভাঙানোর মিল, ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপ, ফটোকপি ও কম্পিউটার দোকান, সেলুন, মোবাইল সার্ভিসিং সেন্টার, ইলেকট্রনিকসের দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কাজ ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী নির্ধারিত সময় দোকান খুলেও বিদ্যুৎ না থাকায় কার্যত বসে থাকছেন। ফলে আয় কমে যাচ্ছে এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা।

উপজেলা সদরের মোজাম্মেল ইলেকট্রনিক্সের ব্যবসায়ী মোজাম্মেল বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। অনেক ক্রেতা ফ্রিজ, ফ্যান বা অন্যান্য বৈদ্যুতিক পণ্য কিনতে বা দেখতে আসেন। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় পণ্য চালু করে দেখাতে পারি না। এতে অনেকেই না কিনেই ফিরে যান। প্রতিদিনই বিক্রি কমে যাচ্ছে।"

কৈজুরী গ্রামের ধান ভাঙানোর মিলের মালিক মো. সোবহান আলী বলেন, আগে সারাদিন বিদ্যুৎ থাকলে ৫০ থেকে ৬০ মণ ধান ভাঙানো যেত। এখন বিদ্যুৎ না থাকায় দিনে দুই থেকে চার মণের বেশি কাজ করা যাচ্ছে না। শ্রমিকদের বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। আয় কমে গেছে, কিন্তু খরচ ঠিকই রয়েছে।"

লোডশেডিংয়ের কারণে কৃষকেরাও বিপাকে পড়েছেন। সেচের জন্য বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল কৃষকদের সময়মতো জমিতে পানি দিতে না পারায় উৎপাদন নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। পাশাপাশি বারবার বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার কারণে সেচ পাম্পসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

কৃষক ববিউল আলম বলেন, "সময়ে পানি দিতে না পারলে ফসলের ক্ষতি হবে। আবার বারবার বিদ্যুৎ ওঠানামার কারণে সেচ পাম্প নষ্ট হওয়ার ভয়ও রয়েছে। কৃষিকাজ এখন পুরোপুরি বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল।"

শুধু ব্যবসা বা কৃষিই নয়, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে। সন্ধ্যার পর দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী মোমবাতি বা চার্জলাইটের আলোয় পড়তে বাধ্য হচ্ছে। গরমের কারণে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

স্থানীয় শিক্ষার্থী সিয়াম বলে, সামনে পরীক্ষা। কিন্তু রাতে ঘনঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ঠিকমতো পড়তে পারছি না। গরমে বসে থাকাও কঠিন হয়ে যায়। এভাবে চলতে থাকলে পরীক্ষার প্রস্তুতি ভালোভাবে নেওয়া সম্ভব হবে না।

এদিকে গত শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সাটুরিয়া-১ উপকেন্দ্রের আওতাধীন সব ফিডারে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানায়, ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনের দুই পাশের গাছের ডালপালা অপসারণের কাজের জন্য ওই সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে বিকেলে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু হলেও সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ঘণ্টাখানেক পর থেকেই আবার শুরু হয় দফায় দফায় লোডশেডিং। শনিবার রাত থেকে রোববার পর্যন্তও একই চিত্র দেখা গেছে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়।

সাটুরিয়া পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) ওয়ালিউর রহমান বলেন, শনিবার ও রোববার সাটুরিয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ২২ মেগাওয়াট। কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে বরাদ্দ পাওয়া গেছে মাত্র ১৬ থেকে ১৮ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিনই ৪ থেকে ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি থাকছে। এই ঘাটতির কারণে পুরো উপজেলায় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়েই বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বরাদ্দ বাড়লে লোডশেডিংয়ের পরিমাণও কমে আসবে। আপাতত জাতীয় গ্রিড থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়েই সব এলাকায় সমন্বয় করে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে।

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram