ঢাকা
২৫শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
দুপুর ১২:৫৭
logo
প্রকাশিত : জুন ২৫, ২০২৬

শিক্ষার আড়ালে প্রধান শিক্ষকের দুর্নীতির সাম্রাজ্য!

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার ঐতিহ্যবাহী ও একমাত্র নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নাছরীন নবী পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দেবব্রত বণিকের (পরিমল বণিক) বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ, কোচিং ও গাইড বই সিন্ডিকেট, প্রাইভেট বাণিজ্য এবং অ্যাকাডেমিক দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব অনিয়মে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। শিক্ষক সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানটিতে ১৯ জন এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও ৮ জন অতিথি শিক্ষক রয়েছেন। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন দেবব্রত বণিক। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিকে ১৩ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে তিনি প্রধান শিক্ষকের পদ লাভ করেন।

জানা গেছে, ২০১৫ সালে স্কুল ও কলেজ শাখায় শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে প্রায় ৩১ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিদ্যালয়ের পুরোনো তিনতলা ভবন নির্মাণের জন্য এক দাতা সদস্যের দেওয়া প্রায় ১৭ লাখ টাকা বিদ্যালয়ের মূল ব্যাংক হিসাবে জমা না করে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

বিদ্যালয়ের একটি অভ্যন্তরীণ অডিট প্রতিবেদনে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে লক্ষাধিক টাকা আত্মসাৎ ও ২৪টি অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের এপ্রিলে তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটি তাকে দুই বছরের জন্য সাময়িক বরখাস্ত করে। পরে একটি স্ট্যাম্পে লিখিত অঙ্গীকারনামার ভিত্তিতে বিশেষ শর্তে তাকে পুনর্বহাল করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক পৌর মেয়র ও তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি তাকজিল খলিফা কাজলকে ৮ লাখ টাকা দিয়ে তিনি পুনর্বহাল হন।

অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি সিআরসি প্রকল্পের আওতায় বিদ্যালয়টিকে দেওয়া ১৭টি ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ কম্পিউটারের কোনো হদিশ নেই। বর্তমানে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবের কম্পিউটার দিয়ে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দ সরকারি সম্মানীর অর্থও পরিশোধ না করে আত্মসাৎ করার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক তিন মাসের কোচিংয়ের নামে প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা আদায় করা হয়। তবে মাত্র এক মাস কোচিং পরিচালনা করে বাকি অর্থ বিদ্যালয়ের মূল হিসাবের বাইরে রেখে প্রধান শিক্ষক ও কয়েকজন শিক্ষক ভাগাভাগি করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এছাড়া শিক্ষার্থীদের পরিচয়পত্র দেওয়ার কথা বলে জনপ্রতি ২৫০ টাকা করে আদায় করা হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অনেক শিক্ষার্থী পরিচয়পত্র পায়নি বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা।

পৌর শহরের একটি লাইব্রেরির মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রকাশনীর বই শিক্ষার্থীদের কিনতে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে। এর বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট প্রকাশনী থেকে প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা কমিশন বা ঘুষ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীদের ওপর এসব বই চাপিয়ে দিতে মডেল টেস্ট ও সাজেশননির্ভর শিক্ষা পদ্ধতি চালুরও অভিযোগ রয়েছে।

বিদ্যালয়ের সহকারী বাংলা শিক্ষিকা শিখা বণিক, প্রধান শিক্ষক দেবব্রত বণিকের স্ত্রী। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত না থাকলেও তার ক্লাস অন্য শিক্ষক দিয়ে পরিচালনা করা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। প্রতিবছর টেস্ট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আগেই ফাঁস করা, নির্দিষ্ট শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট না পড়লে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো এবং শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টির অভিযোগও রয়েছে।

ইংরেজি শিক্ষক মোখলেছুর রহমানের বিরুদ্ধে নিয়মিত ক্লাসে অনুপস্থিত থাকা এবং নিজের কোচিংয়ের শিক্ষার্থীদের দিয়ে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন ও ফলাফল তৈরির অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে গণিত শিক্ষক খোরশেদ আলমের বিরুদ্ধে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট বাণিজ্য পরিচালনা এবং প্রধান শিক্ষকের পক্ষে সিন্ডিকেট সক্রিয় রাখতে অন্য শিক্ষকদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে।

এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে ঠিকমতো পাঠদান হয় না। আমার মেয়েসহ সব শিক্ষার্থীর কাছ থেকে পরিচয়পত্রের জন্য টাকা নেওয়া হয়েছে, কিন্তু ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও পরিচয়পত্র দেওয়া হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক দেবব্রত বণিক বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। বিদ্যালয়ের সব নিয়মনীতি অনুসরণ করেই কাজ করেছি। আমাকে নিয়ে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছিল, সেগুলো ছিল তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ষড়যন্ত্রের অংশ।

সাবেক অভিভাবক সদস্য শামীম একবাল বলেন, বিভিন্ন সময়ে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড, জেলা শিক্ষা অফিস ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সাবেক গভর্নিং বডির সদস্য আশিকুর রহমান রানা বলেন, এত অভিযোগ ও অনিয়মের পরও একজন প্রধান শিক্ষক কীভাবে বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন, সেটি বিস্ময়কর।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আবু তৌহিদ বলেন, অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বর্তমান অ্যাডহক কমিটির সভাপতি শাহাদাত হোসেন লিটন বলেন, আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনিয়মের বিষয় আমার নজরে এসেছে। সবকিছু খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাপসী রাবেয়া বলেন, প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাকে বিভিন্ন সময়ে সতর্কও করা হয়েছে। অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram