ঢাকা
২০শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
বিকাল ৪:৫৪
logo
প্রকাশিত : জুন ২০, ২০২৬

চীনা জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কিনছে বাংলাদেশ, উদ্বিগ্ন ভারত

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নের লক্ষ্যে চীনের তৈরি ২০টি জে-১০সিই (J-10CE) মাল্টিরোল ফাইটার জেট ক্রয়ের সিদ্ধান্ত দক্ষিণ এশিয়ার আকাশসীমায় এক বিশাল কৌশলগত পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। ২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই বিশাল প্রতিরক্ষা চুক্তিটিকে নয়াদিল্লি কেবল একটি সাধারণ সামরিক কেনাকাটা হিসেবে দেখছে না, বরং এটিকে ভারতের চারপাশে চীনের সামরিক বেষ্টনী বা ‘কৌশলগত ঘেরাও’-এর অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।

এ নিয়ে বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়া একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর, প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই যুদ্ধবিমান ক্রয়ের আলোচনাকে গতিশীল করে। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারও এই প্রতিরক্ষা নীতি সচল রেখেছে। এই চুক্তি ঢাকা ও বেইজিংয়ের সামরিক সম্পর্ককে এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে, যা ভারতের পূর্ব সীমান্তে নতুন নিরাপত্তা সমীকরণ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদী ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর অংশ হিসেবে এই চুক্তিটি করা হচ্ছে। বিমান বাহিনীর বর্তমান বহরে থাকা পুরোনো এফ-৭ এবং সীমিত সংখ্যক মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান পরিবর্তন করে আকাশসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করতে এই আধুনিক ফাইটার জেটগুলো অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।

প্রায় ২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই চুক্তিটির অর্থ আগামী ১০ বছরের সহজ কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে। এর ফলে জাতীয় রাজস্বের ওপর তাৎক্ষণিক কোনো বড় চাপ ছাড়াই বাংলাদেশ তার সামরিক বাহিনীকে আধুনিক করার সুযোগ পাচ্ছে। ২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে ফাইটার জেটগুলো বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এই প্যাকেজের আওতায় শুধু যুদ্ধবিমানই নয়, বরং লজিস্টিকস, পাইলট ও ক্রু ট্রেনিং, দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ এবং উন্নত যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ নিশ্চিত করবে চীন, যা দুই দেশের সামরিক নির্ভরতাকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করবে।

বাংলাদেশের এই সামরিক আধুনিকায়ন ভারতের প্রতিরক্ষা মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত করেছে সংকীর্ণ শিলিগুড়ি করিডোর, যা সামরিক পরিভাষায় ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত। ভারতের সামরিক পরিকল্পনাবিদদের আশঙ্কা, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় বিমান ঘাঁটিগুলোতে এই আধুনিক চীনা ফাইটার জেট মোতায়েন করা হলে তা শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তার জন্য বড় মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করবে। ভারতের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল অনিল চৌহান ইতিপূর্বেই চীন, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মধ্যে সম্ভাব্য ‘স্বার্থের মিলন’ নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন, যা ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা নীতিকে নতুন করে সাজাতে বাধ্য করছে।

‘অপারেশন সিন্দুর’ এবং জে-১০সিই-এর যুদ্ধক্ষমতা
জে-১০সিই মূলত একটি ৪.৫ প্রজন্মের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘটিত সংক্ষিপ্ত আকাশযুদ্ধ ‘অপারেশন সিন্দুর’-এ পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর জে-১০সি ফাইটার জেটের দুর্দান্ত কার্যকারিতা প্রদর্শনের পর এই বিমানের প্রতি বৈশ্বিক আগ্রহ, বিশেষ করে বাংলাদেশের আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যায়।

এই ফাইটার জেটটি অত্যন্ত শক্তিশালী অ্যাক্টিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে রাডারে সজ্জিত, যা একসাথে একাধিক লক্ষ্যবস্তু ট্র্যাক করতে পারে এবং শত্রুপক্ষের ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর। এছাড়া বিমানটি চীনের তৈরি দূরপাল্লার বিয়ন্ড-ভিজ্যুয়াল-রেঞ্জ এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল ‘পিএল-১৫’ ছুঁড়তে সক্ষম, যা যেকোনো আধুনিক পশ্চিমা বা রুশ বিমানকে আকাশযুদ্ধে বড় চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। উন্নত ডেটা লিংক এবং এয়ারবোর্ন আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমের মাধ্যমে এটি যুদ্ধক্ষেত্রে নিখুঁত নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক সমন্বয় তৈরি করতে সক্ষম।

বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও ঢাকা-দিল্লি কূটনৈতিক টানাপোড়েন
বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের ৭০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ করে চীন। সাবমেরিন, ট্যাংক, মিসাইল সিস্টেম এবং যুদ্ধজাহাজের পর এবার অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সরবরাহের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ইকোসিস্টেমে চীনের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় হচ্ছে। শেখ হাসিনা সরকারের বিদায়ের পর ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কিছুটা শীতলতা এসেছে।

ট্রানজিট, বাণিজ্য, তিস্তা নদীর পানি বণ্টন এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো সংবেদনশীল ইস্যুগুলোতে যখন দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের কূটনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই চীনের সাথে এই মেগা চুক্তি বেইজিংয়ের প্রতি ঢাকার কৌশলগত ঝুঁকে পড়াকেই নির্দেশ করে। যদিও বেইজিংয়ের সাথে এই চুক্তিকে বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে নিজস্ব সার্বভৌম সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে এবং ভারতের বিরুদ্ধে কোনো জোটে শামিল হওয়া এর উদ্দেশ্য নয় বলে মনে করে ঢাকা।

দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিযোগিতামূলক নিরাপত্তার নতুন যুগ
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য এবং সীমান্ত সুরক্ষায় পারস্পরিক নির্ভরতা থাকার কারণে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা নেই। তবে সম্পর্কের ধরনটি আগের ‘বিশেষ বন্ধুত্ব’ থেকে বদলে গিয়ে এখন অনেকটাই আনুষ্ঠানিক, সতর্কতামূলক ও দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট রূপ নিতে যাচ্ছে। ২০টি জে-১০সিই ফাইটার জেট ক্রয়ের এই সিদ্ধান্ত কেবল বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতাই বাড়াবে না, বরং এটি বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে চীনের ভূরাজনৈতিক প্রভাবকে আরও দৃশ্যমান করবে। এর ফলে, দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন একটি নতুন এবং অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক যুগে পদার্পণ করছে, যেখানে প্রতিটি দেশের সামরিক সিদ্ধান্তই আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে পুনর্নির্ধারণ করছে।

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram