

আধুনিক সমাজে সম্পর্কের সমীকরণ বদলাচ্ছে দ্রুত। একসময় যেখানে পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী হিসেবে পুরুষকে ধরা হতো, এখন সেই চিত্র অনেক জায়গায় বদলে যাচ্ছে। নারীরা ক্রমশ বেশি উপার্জন করছেন, আর অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের প্রধান অর্থনৈতিক দায়িত্বও তাদের হাতে যাচ্ছে। আর এই পরিবর্তনই পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মসম্মানে প্রভাব পড়ে? এমন প্রশ্নকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণা।
যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডন, ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্রের মাউন্ট সিনাই মেডিকেল স্কুল, সুইডেনের দীর্ঘমেয়াদি আয়ের তথ্য বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা আইপসস–এর গবেষণা তথ্য মিলিয়ে দেখা গেছে, পারিবারিক আয়ের ভারসাম্য বদলালে সম্পর্কের ক্ষমতার সমীকরণেও পরিবর্তন আসে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া কয়েকজন পুরুষ জানিয়েছেন, স্ত্রী বেশি আয় করলে সমাজ ও আশপাশের মানুষের আচরণ অনেক সময় তাদের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কেউ কেউ জানান, ঐতিহ্যগত ধারণায় ‘পুরুষই উপার্জন করবে’—এই প্রত্যাশা ভেঙে গেলে মানসিক চাপ তৈরি হয়।
গবেষকদের মতে, টাকা ও ক্ষমতা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তাই পরিবারের ভেতরে পুরুষ যদি প্রধান উপার্জনকারী না থাকেন, তবে অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেদের ক্ষমতাহীন মনে করতে পারেন, যা মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সুইডেনে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, যখন স্ত্রীরা স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করতে শুরু করেন, তখন পুরুষদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যার হার প্রায় ১১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। একই সময়ে নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই কিছুটা মানসিক চাপ বৃদ্ধি দেখা গেলেও পুরুষদের ওপর প্রভাব তুলনামূলক বেশি।
যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ডেমিড গেটিক জানান, এই পরিবর্তন শুধু আয়ের নয়, বরং সম্পর্কের সন্তুষ্টির সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে। তবে তিনি এটিও বলেন, সব ক্ষেত্রে বিষয়টি একভাবে কাজ করে না।
অন্যদিকে গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, অনেক ক্ষেত্রে নারী বেশি উপার্জন করলেও ঘরের কাজ ও সন্তান পালনের দায়িত্ব এখনও নারীদের ওপরেই বেশি থাকে। ফলে পরিবারে ভারসাম্য পুরোপুরি বদলায় না।
তবে সব দিকই নেতিবাচক নয়। গবেষণা বলছে, পুরুষরা যখন সন্তান লালন-পালনে বেশি সময় দেন, তখন পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক আরও মজবুত হয় এবং সন্তানের সঙ্গে বন্ধনও গভীর হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি পারিবারিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাজে ধীরে ধীরে ‘পুরুষই একমাত্র উপার্জনকারী’—এই ধারণা বদলাচ্ছে। তবে পরিবর্তনের গতি ধীর হওয়ায় অনেক পুরুষ এখনো নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সমস্যায় পড়ছেন।
গবেষকরা মনে করেন, ভবিষ্যতে যদি পারিবারিক ভূমিকা আরও সমানভাবে ভাগ করা যায়, তবে সম্পর্কের ভারসাম্য ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
