

সাইফুল ইসলাম, বাবুগঞ্জ (বরিশাল) প্রতিনিধি: পঞ্চাশোর্ধ আবুল কালাম হাওলাদার। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার সবচেয়ে বড় চাওয়া একটি নিরাপদ আশ্রয়। মাথার ওপর একটি টেকসই ছাদ আর দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছেন একটি জরাজীর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে। যেখানে নেই নিরাপদ বসবাসের পরিবেশ, নেই বিদ্যুতের ব্যবস্থা, নেই ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা।
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব রহমতপুর গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম হাওলাদার (৫৫) ও তার স্ত্রী নাসিমা বেগম (৪৫) দীর্ঘদিন ধরে চরম দারিদ্র্য ও মানবেতর জীবনযাপনের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আবুল কালাম চার মেয়ে ও দুই ছেলের জনক। প্রথম স্ত্রী তাকে ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার পর দীর্ঘদিন একাকী জীবন কাটান। পরে দ্বিতীয়বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নাসিমা বেগমকে নিয়ে পূর্ব রহমতপুর গ্রামে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু জীবনের অভাব-অনটন যেন তার পিছু ছাড়েনি।
নিজস্ব কোনো আয়ের উৎস না থাকায় জীবিকার তাগিদে রহমতপুর বিমানবন্দর এলাকার এক ব্যক্তির কাছ থেকে দৈনিক ২০০ টাকা ভাড়ায় একটি ব্যাটারিচালিত ভ্যান নিয়ে চালান তিনি। সারাদিন পরিশ্রমের পর যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। কখনো একবেলা খেয়ে, কখনো না খেয়েই দিন কাটাতে হয় এই দম্পতিকে।
সরেজমিনে দেখা যায়, আবুল কালামের জমিজমা বলতে তেমন কিছুই নেই। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ভিটায় একটি মাত্র বসতঘর রয়েছে। ঘরটির টিন মরিচা পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে, বিভিন্ন স্থানে ফাঁকা। নেই মজবুত দরজা-জানালা কিংবা নিরাপদ বেড়া। ছেঁড়া কাপড় ও ভাঙাচোরা টিন দিয়ে কোনোরকমে টিকে আছে ঘরটি। এমনকি ঘরটিতে বিদ্যুতেরও কোনো ব্যবস্থা নেই। সন্ধ্যা নামলেই নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। কুপিবাতির ক্ষীণ আলোই তাদের রাতের একমাত্র ভরসা। ঝড়-বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতরে পানি পড়ে, আর দুর্যোগপূর্ণ রাতে আতঙ্কে নির্ঘুম সময় কাটাতে হয় তাদের।
কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আবুল কালাম হাওলাদার। তিনি বলেন, সরকারের কাছে আমার বেশি কিছু চাওয়া নাই। শুধু মাথা গোঁজার মতো একটা ঘর চাই। বয়স হয়ে গেছে, আগের মতো কাজ করতে পারি না। স্ত্রীকে নিয়ে খুব কষ্টে জীবন কাটাই। কোনোদিন একবেলা খাই, কোনোদিন না খেয়েই থাকতে হয়। তিনি আরও বলেন, ভ্যান ভাড়া করে চালাই। যা আয় হয়, তা দিয়ে খাবার কিনতেই কষ্ট হয়। ঘর মেরামত করার সামর্থ্য আমার নেই। বৃষ্টি হলেই ঘরের মধ্যে পানি পড়ে। রাতভর জেগে থাকতে হয়।
স্থানীয় প্রতিবেশী মঞ্জু আরা বেগম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আবুল কালাম খুব কষ্টে জীবনযাপন করছেন। সরকারি কোনো সহায়তা কিংবা আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর তিনি পাননি। আমরা চাই প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবান মানুষ তার পাশে দাঁড়াক।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. শাহজাহান বাদশা বলেন, আবুল কালাম অত্যন্ত অসহায় একজন মানুষ। তার বিষয়টি আমার জানা আছে। সরকারি সহায়তা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করবো। তবে তার জাতীয় পরিচয়পত্র এ এলাকার না হওয়ায় কিছুটা জটিলতা রয়েছে। তারপরও তার স্ত্রীর নামে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মাঝে মাঝে সহায়তা দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা উল হুসনা বলেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। তিনি যদি সরকারি সহায়তার জন্য উপযুক্ত বিবেচিত হন, তাহলে নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রাষ্ট্রের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, আশ্রয়ণ প্রকল্প ও গৃহহীনদের পুনর্বাসন কার্যক্রম চলমান থাকলেও আবুল কালাম হাওলাদারের মতো অনেক অসহায় মানুষ এখনো সেই সুবিধার অপেক্ষায় দিন গুনছেন। জীবনের শেষ বেলায় তার একটাই আকুতি, মাথা গোঁজার জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়।
