

দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহে বড় ধরনের ধস নেমেছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। আস্থা সংকট ও উচ্চ সুদহার এবং ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতাকে এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট ও আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহে
প্রভাব ফেলেছে। এদিকে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি কমলেও সরকারের ব্যাংকঋণ বেড়েই চলেছে। ফলে অনেক ব্যাংকের তহবিল সরকারি ঋণে চলে যাচ্ছে, যা বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ আরও সংকুচিত করছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীসহ খাত-সংশ্লিষ্টরা। অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি ঋণের এই ধীরগতি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ শিল্প উৎপাদন, নতুন কর্মসংস্থান, আমদানি বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বড় অংশই ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। প্রবৃদ্ধি এত নিচে নেমে যাওয়া অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমলেও বিনিয়োগ পরিবেশ আগের মতোই রয়ে গেছে। আবার খেলাপি ঋণের চাপে অনেক ব্যাংকঋণ দিতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তবে ব্যবসা ও বিনিয়োগের স্বার্থে নেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্প্রতিক পদক্ষেপ আগামীতে বেসরকারি খাতের ঋণে গতি বাড়াতে সহায়ক হতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত মার্চ মাস শেষে বেসরকারি খাতে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৬৭২ কোটি টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ১৭ লাখ ১৯ হাজার ৫১২ কোটি টাকা। ফলে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ, যা ইতিহাসে সর্বনিম্ন। আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি খাতে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ, যা এতদিন সর্বনিম্ন ছিল। তার আগের মাস জানুয়ারি মাসেও ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ। তবে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। তথ্য পর্যালোচনায আরও দেখা যায়, ২০২৫ সালের মে মাসে প্রথমবার বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ঘরে নেমে আসে। এরপর থেকে টানা ১০ মাস ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ঘরেই ছিল। যেমন- ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। পরের মাস মে’তে তা কমে ৬ দশমিক ৯৫ শতাংশে দাঁড়ায়। এরপর জুনে ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ, জুলাইয়ে ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ, আগস্টে ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ, অক্টোবরে ৬ দমমিক ২৩ শতাংশ, নভেম্বরে ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ, ডিসেম্বরে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ এবং জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে তা ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে স্থির ছিল।
ব্যবসায়ীদের মতে, বিনিয়োগে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চ সুদহার। বর্তমানে ব্যাংকঋণের সুদ ১৪-১৫ শতাংশ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি খাতে অনিশ্চয়তা। ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে, অথচ ভোক্তা চাহিদা সেই তুলনায় বাড়েনি। এই বাস্তবতায় নতুন কারখানা স্থাপন বা উৎপাদন সম্প্রসারণে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না উদ্যোক্তারা। নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বর্তমানে ব্যাংকঋণের সুদহার অনেক বেশি। এই সুদে উৎপাদন ও বিনিয়োগ টেকসই রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয় বৈশি^ক যুদ্ধের প্রভাব। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছে। তার মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সুদহার এমন পর্যায়ে আনা দরকার, যাতে ব্যবসা-বাণিজ্য সচল থাকে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এখানে দ্রুত হস্তক্ষেপ করা উচিত।
এদিকে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে গতি আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যেই বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সর্বশেষ বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও একক গ্রাহকের ঋণ সীমা ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করেছে। আগামী ২০২৮ সালের ৩০ জুন জুন পর্যন্ত এ সুবিধা কার্যকর থাকবে। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ব্যাংকগুলো আগের তুলনায় বড় অঙ্কের ঋণ দিতে পারবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়নে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে দেশের ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা ও আর্থিক কার্যক্রম পুনর্গঠনে নীতি সুবিধার সময়সীমা বাড়ানো হয়। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে এ সুবিধার জন্য আবেদন করা যাবে। এ ছাড়া বন্ধ কারখানা চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটি বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের কাজ চলছে।

