

শুধু মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে সব অর্থনৈতিক গতিপথ প্রায় রুদ্ধ করে ফেলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থনীতির প্রাণ বেসরকারি খাত এখন ঋণ খরায় প্রায় অচল হওয়ার পথে।
সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কঠোর কড়াকড়িতে বলতে গেলে ঋণই পাচ্ছেন না বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য-উপাত্ত থেকে বেসরকারি খাতের ঋণের ‘কঙ্কালসার’ চিত্র ফুটে উঠছে। গত মার্চ মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড সবচেয়ে কম ঋণ পেয়েছে বেসরকারি খাত। এ সময়ে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪.৭২ শতাংশে এসে ঠেকেছে।
এটা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। বাংলাদেশ ব্যাংক দুই দশকের বেশি তথ্য সংরক্ষণ করে না। তাই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন কম ঋণপ্রবাহ দেখানো হলেও বাস্তবে এটিই বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম ঋণপ্রবাহ। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, বিনিয়োগ স্থবিরতা, ব্যাবসায়িক আস্থার ভাঙন এবং নীতিগত অনিশ্চয়তায় বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর ধরেই বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী। ২০২৫ সালের নভেম্বরের ৬.৫৮ শতাংশ থেকে ধীরে ধীরে কমে ডিসেম্বরে ৬.২ শতাংশে নামে। চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে তা ৬.০৩ শতাংশে স্থির থাকলেও মার্চে হঠাৎ বড় পতন ঘটে। বর্তমানে বেসরকারি খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ লাখ কোটি টাকা।
বিশ্লেষকদের মতে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর রাজনৈতিক চাপ কিছুটা কমলেও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়নি।
বরং উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি, নীতিগত অস্পষ্টতা ও জ্বালানিসংকট একসঙ্গে বিনিয়োগকে নিরুৎসাহ করছে। তবে সবচেয়ে বড় কারণ হলো উচ্চ সুদের হার। বর্তমানে বেসরকারি খাতের ঋণের সুদের হার ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত। এই সুদের হারে বিনিয়োগ করে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা প্রায় কঠিন। এমন অবস্থায় কেউ ঋণ নিতে আগ্রহী নয়। ফলে কমতে কমতে ঋণের প্রবৃদ্ধি সর্বকালের সর্বনিম্ন স্তরে এসে ঠেকেছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আংশিক ফিরলেও বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য শর্ত এখনো অনুপস্থিত। মূল্যস্ফীতি, লজিস্টিক ব্যয় ও সামগ্রিক অনিশ্চয়তা ব্যবসায়ীদের নতুন করে ঝুঁকি নিতে নিরুৎসাহ করছে। মার্চ মাসে জ্বালানিসংকট পরিস্থিতিকে আরো চাপের মধ্যে ফেলেছে। একাধিক সমস্যা আগে থেকেই ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানিসংকট। মূল্যস্ফীতি, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় এবং অন্য বিষয়গুলো অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ কমেছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, গত ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি খাতে মোট ঋণ বিতরণ হয়েছে ১৭ লাখ ৮৫ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা। এক বছর আগে এটি ছিল ১৭ লাখ ৪৭ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬.০৩ শতাংশ। মার্চে সেই ঋণের পরিমাণ আরো কমেছে। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে (জানুয়ারি-জুন) বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য রেখেছে ৮.৫ শতাংশ। এই লক্ষ্য কোনো মাসেই অর্জন হয়নি।
ব্যাংকারদের ভাষ্য আরো উদ্বেগজনক। তাঁরা জানান, বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর উৎপাদন কমে যাওয়া কিংবা কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঋণের চাহিদা কমে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে না। ফলে নতুন ঋণ নেওয়ার প্রবণতা তলানিতে নেমেছে।
নীতিগত দিকনির্দেশনা নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে ব্যাংক খাতে। ব্যাংকারদের মতে, সুদের হার, বিনিময় হার ও মূল্যস্ফীতি—এই তিনটি মৌলিক বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান এখনো পরিষ্কার নয়। এতে ঋণ অনুমোদন ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য এ পরিস্থিতিতেও আগের ধ্যান-ধারণা নিয়েই আছে। তারা সুদের হার পর্যালোচনার বিষয়ে বেশ রক্ষণশীল এখনো। সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে সুদের হার কমানোর আলোচনা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার কৃত্রিমভাবে স্থির রাখার সিদ্ধান্তও বাজারে চাপ বাড়াচ্ছে। এদিকে সংকটকালেও ট্রেড ফিন্যান্সে সুদের হার সীমিত করার সিদ্ধান্ত ব্যাংকগুলোকে আরো চাপে ফেলেছে। ফলে বিদেশি বাণিজ্য অর্থায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে এবং ব্যবসায়ীরা বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন।
বেসরকারি খাতে ঋণ চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো এখন ঝুঁকিমুক্ত সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ট্রেজারি বিল ও বন্ডে তুলনামূলক বেশি নিরাপত্তা ও স্থিতিশীল আয় থাকায় এই প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকার ৩৩ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে, যা এপ্রিল মাসে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬ হাজার কোটি টাকায়। এতে বোঝা যায়, বেসরকারি খাতকে ঋণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখলেও সরকার ঠিকই ব্যাংক খাতের ওপর দিনে দিনে আরো বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাত ‘ক্রাউড আউট’ হয়ে পড়ে। অর্থাৎ ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হন। সব মিলিয়ে বিনিয়োগে স্থবিরতা, ঋণ প্রবৃদ্ধিতে ধস এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা—এই তিনের সমন্বয়ে অর্থনীতি এখন একটি স্পষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শিল্প-কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। তখন বিনিয়োগও কম হয়েছে। সেই বিনিয়োগখরা এখনো রয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করতে সাহস পাচ্ছেন না। তাই বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। তবে নতুন সরকার আসার পর বন্ধ কারখানা খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন নীতি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। অচিরেই বিনিয়োগ পরিস্থিতির সঙ্গে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধিরও উন্নতি হবে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘এত দিন কোনো নির্বাচিত সরকার ছিল না। তাই বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি এমন তলানিতে নেমেছে। তারা কোনো বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি; বরং ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের আরো ক্ষতি করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার ছিল একটি ব্যবসাবিরোধী সরকার। শুধু বাণিজ্য খাত নয়, ওই সরকার ব্যাংকগুলোকে দুর্বল ঘোষণা করার মাধ্যমে পঙ্গু করে দিয়ে গেছে। এখন নির্বাচিত সরকার এসেছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে বিনিয়োগ ঘুরে দাঁড়াবে বলে আমরা আশাবাদী। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও ভালো থাকা জরুরি। যদি যুদ্ধ-বিগ্রহ না থাকে তাহলে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হবেই।’
বিশেষজ্ঞরা জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক উচ্চ সুদের হার কমানোর পথে হাঁটতে পারছে না। তারা শঙ্কিত যে সুদের হার কমিয়ে আনলে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে। কিন্তু একই সময়ে ঠিকই সরকারকে ঋণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরকার এ টাকা নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিচ্ছে। কোনো উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে না এই ঋণ। উল্টো বেশি সুদও দিতে হচ্ছে। কিন্তু এতে বেসরকারি খাত বঞ্চিত হওয়ার ফলে পণ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পরিণামে তা মূল্যস্ফীতি আরো বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তাঁরা মনে করেন, সুদের হার কমানো হলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বাড়ত। তখন বেসরকারি খাত চাঙ্গা হতো। এতে মানুষের কাজের সুযোগ বাড়ত এবং পণ্য সরবরাহ বাড়ত। ফলে ধীরে ধীরে পণ্যের দামও কমে আসার সুযোগ তৈরি হতো। কিন্তু এখন তো মূল্যস্ফীতিও কমছে না, আবার বেসরকারি খাতও বসে পড়ছে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি অর্থনীতির জন্য অনেকটাই অশনিসংকেত বলে মনে করছেন তাঁরা।

