

অলিম্পিক গেমসে স্বর্ণ জিতলেই নগদ পুরস্কার হিসাবে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদরা পাবেন দুই কোটি টাকা। রুপাজয়ীরা পাবেন দেড় কোটি টাকা এবং ব্রোঞ্জ পদকজয়ীরা পাবেন এক কোটি টাকা করে। এ পুরস্কার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সরকার।
দেশের ক্রীড়াঙ্গনে সূচিত হয়েছে এক নতুন যুগের। প্রণোদনা ও ভাতা কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছে জাতীয় ক্রীড়া উন্নয়ন তহবিল নীতিমালা, ২০২৬ এর গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে। ২৯ এপ্রিল যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ক্রীড়া-১ শাখা থেকে জারি করা এ নীতিমালা রোববার বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। নীতিমালায় বলা হয়েছে, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ অসংখ্য আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়াবিদ তৈরি করেছে। তবে তাদের বড় একটি অংশ ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে এসে চরম অর্থকষ্টে ভোগেন। এই বাস্তবতা থেকেই একটি টেকসই, প্রাতিষ্ঠানিক ও সুরক্ষাভিত্তিক ক্রীড়া কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এশিয়ান গেমসে স্বর্ণ জিতলে এক কোটি, রুপা জিতলে ৫০ লাখ এবং ব্রোঞ্জ জিতলে মিলবে ৩০ লাখ টাকা। কমনওয়েলথ গেমসে এ পুরস্কারের হার যথাক্রমে ৫০ লাখ, ৩০ লাখ ও ২৫ লাখ টাকা। বিশ্বকাপ ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে পদকজয়ীরা পাবেন ৩০ লাখ, ২০ লাখ ও ১০ লাখ টাকা। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ান (এসএ) গেমসে স্বর্ণের জন্য পাঁচ লাখ, রুপার জন্য তিন লাখ এবং ব্রোঞ্জের জন্য দুই লাখ টাকা পুরস্কার নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে কোনো অর্জনের জন্য পৃথকভাবে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বিশেষ পুরস্কার এবং চিকিৎসা সহায়তা হিসাবে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা আর্থিক সহায়তার বিধান রাখা হয়েছে নীতিমালায়।
নীতিমালার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ক্রীড়াবিদদের জন্য মাসিক ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আওতায় আন্তর্জাতিক স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত ও জাতীয় পর্যায়ের সেরা ক্রীড়াবিদরা মাসিক এক লাখ ৫০ হাজার টাকা ভাতা পাবেন। জাতীয় দলের নিয়মিত খেলোয়াড়রা (যারা অন্তত দুই বছরে দুটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন) পাবেন এক লাখ টাকা এবং সম্ভাবনাময় ক্রীড়াবিদদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ হাজার টাকা মাসিক ভাতা।
জাতীয় ক্রীড়া উন্নয়ন তহবিল পরিচালিত হবে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অধীনে। এই তহবিল গঠিত হবে সরকারি অনুদান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের বাজেটের ন্যূনতম ১০ শতাংশ বরাদ্দ, ক্লাব ও ফেডারেশনের লাইসেন্স ফি, স্পন্সরশিপ ও সম্প্রচার স্বত্ব থেকে ন্যূনতম ২৫ শতাংশ আয়, দান-অনুদান এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার মাধ্যমে।
তহবিল পরিচালনায় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। নির্বাহী পরিচালক, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এবং পরিচালক (প্রশাসন) এই তিনজনের মধ্যে যে কোনো দুজনের যৌথ স্বাক্ষরে তহবিলের অর্থ উত্তোলনের বিধান রাখা হয়েছে। দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থাকবে নির্বাহী পরিচালকের ওপর।
নীতিমালায় ক্রীড়াবিদ নির্বাচনের জন্য তিন স্তরের মূল্যায়ন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমে কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন কমিটি পারফরম্যান্স, ফিটনেস ও শৃঙ্খলার ভিত্তিতে প্রাথমিক তালিকা তৈরি করবে। এরপর ক্রীড়াবিদ বাছাই কমিটি যাচাই-বাছাই শেষে সুপারিশ প্রেরণ করবে। সবশেষ পর্যায়ে ক্রীড়াবিদ বাছাই জাতীয় কমিটি চূড়ান্ত তালিকা অনুমোদন করে সরকারের কাছে পাঠাবে এবং গেজেটে প্রকাশ করা হবে। প্রতি তিন মাস অন্তর পারফরম্যান্স মূল্যায়নের মাধ্যমে তালিকা হালনাগাদ করা হবে। রিভিউ বোর্ডকে দেওয়া হয়েছে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা, যার সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক এবং আপিল নিষ্পত্তির সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ কর্মদিবস।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, এই ভাতা শুধু সহায়তা নয়, বরং ক্রীড়াবিদদের পেশাগত ভবিষ্যতের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার একটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। জাতীয় ক্রীড়াবিদদের জন্য বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য ও দুর্ঘটনা বিমা চালু করা হবে, যার সম্পূর্ণ প্রিমিয়াম তহবিল থেকে বহন করা হবে। চিকিৎসা সহায়তা, শিক্ষা বৃত্তি, জরুরি আর্থিক সহায়তা এবং পরিবারভিত্তিক সুবিধাও এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে। অসুস্থ, আহত, অবসরপ্রাপ্ত বা অসমর্থ ক্রীড়াবিদদের জন্য মাসিক তিন হাজার টাকা ভাতার বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে কোচ, রেফারি, ক্রীড়া সংগঠক ও ক্রীড়া সাংবাদিকদের জন্যও কল্যাণ সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

