

হুমায়ুন কবীর রিন্টু, নড়াইল প্রতিনিধি: নড়াইলের কালিয়ায় আবারও ভুল চিকিৎসায় তাজিন ইসলাম (২০) নামের এক প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘটেছে কালিয়া উপজেলা শহরের খাদিজা সেবা ক্লিনিকে। প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনা ছড়িয়ে পড়ায় বেসরকারি ক্লিনিকটি তালা দিয়ে পালিয়েছে কর্তৃপক্ষ। নিহত তাজিন ইসলাম লোহাগড়া উপজেলার মুচড়া গ্রামের ইয়াছিন মোল্যার স্ত্রী এবং কালিয়া উপজেলার উথলী গ্রামের আইয়ুব শেখের মেয়ে।
সোমবার (১১ মে) সকালে নিহত তাজিনের স্বামী ইয়াছিন মোল্যা সাংবাদিকদের জানান, শনিবার (২ মে) দুপুরে তাজিনের প্রসব বেদনা ওঠে। তার স্বজনরা কালিয়া পৌর এলাকার উথলী বাবার বাড়ি থেকে তাজিনকে নিকটস্থ খাদিজা সেবা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যান। সেখানে খুলনা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক ডা. ইবরাহিম সরদারের তত্ত্বাবধানে সিজারিয়ান অপারেশন সম্পন্ন হয়। তাজিন ছেলে সন্তান জন্ম দেয়। পরদিন রোববার (৩ মে) তাজিনের অবস্থার অবনতি হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। খুলনার ওই বেসরকারি ক্লিনিকে ৭ দিন চিকিৎসা দেয়ার পর তার কোন উন্নতি হয়নি। বরং অবনতি ঘটায় শনিবার (৯ মে) বিকেলে ঢাকায় স্থানান্তরের পরামর্শ দেন ওই বেসরকারি হাসপাতালটি।ওইদিন বিকেলে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রোগীর স্বজনরা খুলনা মেডিকেল কলেজের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করেন। ওই দিন রাত দেড়টার দিক তাজিনের মৃত্যু হয়।
নিহত তাজিনের দুলাভাই ইমামুল ইসলাম রিয়ান অভিযোগ করে বলেন, সাইন বোর্ডে খুলনা মেডিকেল কলেজের বড় ডাক্তারের নাম দেখে তারা তাজিনের সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য রাজি হয়েছিলেন। পরদিন তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কোনো প্রকার ছাড়পত্র না দিয়ে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে রেফার্ড করেন। সেখানে ৭ দিনে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে তাজিনকে সুস্থ করা যায়নি। পরে খুলনা মেডিকেলে তাজিনের মৃত্যু হয়।
খুলনার ওই বেসরকারি হাসপাতাল ও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সিজারিয়ান অপারেশনের সময় উচ্চ রক্তচাপ ছিলো এবং মাত্রাতিরিক্ত অ্যানেস্থেশিয়া প্রয়োগ করা হয় তাজিনের শরীরে। এ কারণেই তিনি স্ট্রোক করে ব্রেনের অংশ ড্যামেজ হয়ে যায়। যার ফলে সে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছে।
একটি সূত্রের দাবি শনিবার (২ মে) প্রসূতি তাজিনের সিজারিয়ান অপারেশনে ডা. নাসির উদ্দিন আহম্মেদ নামের এক চিকিৎসক অ্যানেস্থেশিয়া প্রয়োগ করেছিলেন। যিনি ১৯৯৯ সালে ২ মাসের জন্য ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জনের দায়িত্ব পালন করেন। সরকারি চাকরি থেকে দীর্ঘদিন অবসরে থাকা বয়োজ্যেষ্ঠ এই চিকিৎসক নিয়মিত কালিয়া উপজেলার বেসরকারি ক্লিনিক গুলোতে সিজারিয়ান অপারেশন করে আসছেন।
এদিকে, তাজিন ইসলামের স্বজনদের দাবি তার সিজারিয়ান অপারেশন খুলনা মেডিকেলের চিকিৎসক ডা. ইবরাহিম সরদার সম্পন্ন করেন। তবে প্রসূতির ব্যবস্থাপত্র একই হাতের লেখায় দেখা মেলে ভিন্ন চিত্র। সিজারিয়ান অপারেশন করেছেন ডা. নূর মোহাম্মদ (রাজশাহী মেডিকেল কলেজ) এবং অ্যানেস্থেশিয়া দিয়েছেন ডা. মনির। এদিকে তাজিনের স্বজনরা বলেন, এটা কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। এটি অপচিকিৎসায় একটি হত্যাকান্ড। তার অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তাজিনের স্বজন ও সচেতন মহল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত দেড় বছরে কালিয়া উপজেলার বেসরকারি 'খাদিজা সেবা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার' এর অপচিকিৎসায় এ পর্যন্ত ৬ জন প্রসূতি ও নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে।
গত বছরের ১৪ আগস্ট খাদিজা সেবা ক্লিনিকে লাবনী আক্তার নামের এক প্রসূতির সিজারিয়ান অপারেশন করেন বয়োজ্যেষ্ঠ চিকিৎসক নাসির উদ্দিন আহম্মেদ। পরে প্রসূতির শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে খুলনায় নেয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়। ওইদিন ক্লিনিকটির অপারেশন থিয়েটার সিলগালা করে তদন্ত কমিটি গঠন করে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে অদৃশ্য ক্ষমতাবলে কিছুদিনের মাঝেই আবারও ক্লিনিকটির অপারেশন থিয়েটার খুলে দেয়া হয়। অন্যদিকে তদন্তে অভিযুক্ত চিকিৎসকের অপারেশনে কোনো ধরনের গাফিলতির প্রমাণ না পাওয়ায় তার বিরূদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
কালিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত এক চিকিৎসক জানান, প্রত্যেক চিকিৎসকের বিএমডিসি (বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল) রেজিস্ট্রেশন নং থাকে। যেটি সংশ্লিষ্ট ক্লিনিকের বিজ্ঞাপন পোস্টারে থাকা বাধ্যতামূলক। তবে খাদিজা সেবা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ডাক্তারের নামে স্বনামধন্য মেডিকেল কলেজের নাম ব্যবহার করা হলেও তাদের কারো বিএমডিসি নং চোখে পড়েনি। এমনকি তাদেরকে আমরা কখনো দেখিনি বা চিনিও না।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ জিন্নাতুল ইসলাম জানান, প্রসূতি তাজিন ইসলামের মৃত্যু নিয়ে কেউ কোন অভিযোগ করেনি। তবে এ ঘটনায় অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নড়াইলের সিভিল সার্জন ডা. মো. আব্দুর রশিদ বলেন, এ বিষয়টি আমরা জেনেছি। ক্লিনিক মালিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ক্লিনিকটি তালাবদ্ধ করে পালিয়েছে। আবারও ওই ক্লিনিক সিলগালা করা হবে।

