

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) যখন গত সপ্তাহে ওপেকের সদস্যপদ ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিল, তখন বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজারের বাইরেও এর প্রভাব পড়েছিল। আর ওপেক ছাড়ার এই সিদ্ধান্ত ছিল সৌদি আরবের সঙ্গে আরব আমিরাতের প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের সর্বশেষ দৃষ্টান্ত। যদিও পারস্য উপসাগরের শক্তিধর এই দুই দেশ একসময় ঘনিষ্ঠ অংশীদার ছিল।
শুক্রবার (৮ মে) মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।
ঐতিহাসিকভাবেই তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর শক্তিশালী জোট ওপেকে সৌদি আরবের আধিপত্যই চলে আসছে বরাবর। সৌদি আরব তার বিশাল উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার করে বিশ্ববাজারের তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করে আসত। এই পরিস্থিতিতে চলতি মে মাসেই ওপেক জোট ছাড়ার আমিরাতের সিদ্ধান্ত- দীর্ঘদিনের একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখা হচ্ছে, যে ব্যবস্থাটি মূলত সৌদি নেতৃত্ব দ্বারা পরিচালিত বলে মনে করা হয়।
বর্তমানে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত প্রায় সব ক্ষেত্রেই একে অপরের মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। লিবিয়ার মরুভূমি থেকে শুরু করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার-সবখানেই তাদের রেষারেষি চলছে।
কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের মতে, দেশ দুটির এই বিরোধই মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব যখন প্রশ্নের মুখে, তখন এই দ্বন্দ্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই মতভেদ এশিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের পকেটেও প্রভাব ফেলবে। চলতি মাসে সৌদি নেতৃত্বাধীন তেলের জোট ‘ওপেক’ ছেড়েছে আরব আমিরাত। আবুধাবি জানিয়েছে, তারা এখন প্রতিদিন অতিরিক্ত লাখ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন করবে। এর ফলে ভবিষ্যতে তেলের দাম নির্ধারণ ঘিরে সৌদির সঙ্গে বড় ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে।
ওপেক থেকে আমিরাতের বেরিয়ে যাওয়া মূলত দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটলেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সৌদি ও আমিরাতি নেতাদের মধ্যে এই মতপার্থক্য রাতারাতি তৈরি হয়নি। এক দশক আগে সৌদি আরবের কার্যত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং আমিরাতের নেতা শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদকে আদর্শগতভাবে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখা হতো। দুজনেই ছিলেন উচ্চাভিলাষী এবং আরব বসন্ত পরবর্তী সময়ে নিজেদের শাসনব্যবস্থার ওপর আসা হুমকি মোকাবিলায় এবং মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন রূপ দিতে তারা একযোগে কাজ করেছেন।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দিচ্ছে আরব আমিরাত। ইরান যখন আমিরাতে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, তখন ইসরায়েল তাদের রক্ষায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করে।
একইসঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে মার্কিন ডলার সরবরাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে আমিরাত।
আয়তনে ছোট হলেও আমিরাত পশ্চিমের বিভিন্ন কৌশলগত দেশে স্থানীয় অংশীদার খুঁজে নিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চায়। এতে সৌদি আরব বেশ বিরক্ত। রিয়াদ চায় না কোনো প্রতিবেশী দেশ তাদের সীমানার বাইরে গিয়ে এভাবে প্রভাব খাটাক।
সুদানের গৃহযুদ্ধে এই দুই প্রতিবেশী দেশ বিপরীত পক্ষকে সমর্থন দিচ্ছে। দেশ দুটির সম্পর্কের কতটা অবনতি হয়েছে, তা প্রথম জানায় মিডল ইস্ট আই। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্যারামিলিটারি বাহিনী আরএসএফ-কে সমর্থন দেওয়ায় আমিরাতকে শাস্তি দিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তদবির করেছে সৌদি আরব।
ইরান যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে ইয়েমেনে আমিরাত-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলোর ওপর হামলা চালায় সৌদি আরব। ইয়েমেনের পূর্বাঞ্চলে আমিরাতের প্রভাব ঠেকানোর লড়াইয়ে রিয়াদ এমনকি ওমানকেও পাশে নিয়েছে।
জানা গেছে, এই টানাপোড়েন এমনকি হোয়াইট হাউস পর্যন্ত গড়িয়েছে। গত নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমিরাতি নেতার সঙ্গে এক ফোনালাপে জানান যে, সুদানের আধাসামরিক বাহিনীকে সমর্থনের অভিযোগে সৌদি যুবরাজ তাকে আমিরাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের অনুরোধ করেছিলেন। এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দুই দেশের সম্পর্কের তিক্ততা জনসমক্ষে চলে আসে, যা কয়েক দশকের আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের উষ্ণতাকে মুছে দেয়।
তবে এতকিছুর পরেও কোনো দেশই সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করার ইঙ্গিত দেয়নি। দুই দেশের কর্মকর্তারাই এই সম্পর্ককে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, বড় কোনো সংকটের সময় তারা সবসময় একজোট হয়ে পদক্ষেপ নিয়েছেন।
এর আগে, গত সোমবার ইরান কর্তৃক আমিরাতের ওপর নতুন করে হামলার পর- সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান তাৎক্ষণিকভাবে শেখ মোহাম্মদকে ফোন করে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানান। একইসঙ্গে আমিরাতের নিরাপত্তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন তিনি।
তবে ওপেকের সদস্যপদ ত্যাগের সিদ্ধান্তটি প্রমাণ করে যে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধও দুই নেতার মধ্যে বিদ্যমান মৌলিক উত্তেজনা এবং তিক্ততাকে মুছে দিতে পারছে না। উপসাগরীয় এই দুই পরাশক্তির মধ্যকার এই শীতল সম্পর্ক আগামী কয়েক বছর এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে বলে ধারণা করছে বিশ্লেষকরা।

