ঢাকা
২৭শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সকাল ৭:২২
logo
প্রকাশিত : এপ্রিল ১৩, ২০২৬

বাম্পার ফলনেও বরিশালের তরমুজ চাষিরা হতাশ

জিহাদ রানা, বরিশাল ব্যুরো: মাঠজুড়ে সারি সারি তরমুজ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় সবুজে মোড়া স্বপ্নের জমি। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায় সেই স্বপ্ন ভেঙে এখন শুধু হতাশা, ঋণের চাপ আর অজানা ভবিষ্যতের ভয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকেরা।

বরিশাল বিভাগসহ উপকূলীয় জেলা বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর ও ঝালকাঠিতে এ বছর তরমুজ চাষে রেকর্ড পরিমাণ আবাদ ও উৎপাদন হয়েছে। গত কয়েক বছরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি জমিতে তরমুজ চাষ হওয়ায় শুরুতে কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা দেয়। চরাঞ্চল, নদীতীরবর্তী এলাকা ও উঁচু জমিতে সবুজে ভরে ওঠে তরমুজ ক্ষেত। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দক্ষিণাঞ্চলে তরমুজের আবাদ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। বরিশাল বিভাগে ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে আবাদ ছিল ৪৬,৪৫১ হেক্টর, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪,৫৫১ হেক্টর এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পৌঁছায় ৭০,৩৬২ হেক্টরে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ১১২ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি।

বরিশাল নগরীর পোর্ট রোড, সাততলা ঘাট ও বালুর ঘাটসহ বিভিন্ন আড়তে ট্রলারভর্তি তরমুজ এসে ভিড় জমাচ্ছে। ভোলা, বরগুনা ও পটুয়াখালীর চরাঞ্চল থেকে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ট্রলারে করে তরমুজ এনে বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করছেন। উৎপাদন বেড়ে যাওয়ার ফলে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হয়। এতে তরমুজের দাম দ্রুত কমে যায় এবং পাইকারি বাজারেও ধস নামে।

বর্তমানে খুচরা বাজারে আকারভেদে প্রতিটি তরমুজ ১৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আড়তে প্রতি ১০০টি তরমুজ ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিছু জায়গায় ভালো মানের বড় তরমুজ প্রতি শতক ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হলেও তা আগের বছরের তুলনায় অনেক কম। বরিশালের পোর্ট রোড তরমুজ আড়তের আড়তদার খাজা মো. নজরুল ইসলাম জানান, এ বছর ফলন ভালো হলেও দরপতন হওয়ায় কৃষকরা প্রত্যাশিত দাম পাচ্ছেন না।

ভোলার কৃষক খালেক সরদার জানান, সাড়ে তিন একর জমিতে তরমুজ চাষে তার প্রায় ৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। উৎপাদন ভালো হলেও বাজারে দাম কমে যাওয়ায় তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন। প্রায় ১৭ থেকে ১৮ লাখ টাকা খরচ করেছেন, কিন্তু বিক্রিতে অনিশ্চয়তা রয়েছে। শিলাবৃষ্টিতে কিছু ক্ষতি হলেও বড় সমস্যা হলো বাজারে দাম না পাওয়া। দক্ষিণাঞ্চলে সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবহন সমস্যা। জ্বালানি তেলের সংকট এবং ট্রাকভাড়া বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা মাঠে আসছেন না। আগে যেখানে ট্রাকভাড়া ৩৫ হাজার টাকা ছিল, এখন তা বেড়ে ৫০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। ফলে অনেক ক্ষেতের তরমুজ সময়মতো বাজারে যেতে পারছে না। বরগুনার সদর উপজেলার কৃষক হাবিবুর রহমান জানান, আগে ঢাকায় তরমুজ পাঠাতে ১৮-২৫ হাজার টাকা লাগলেও এখন ৪০-৪৫ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে।

টানা দুই দিনের মাঝারি বৃষ্টিতে বরগুনা, পটুয়াখালী ও আশপাশের এলাকায় তরমুজ ক্ষেতে পানি জমে গেছে। এতে তরমুজ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কৃষকরা শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি সরাচ্ছেন, কেউ নালা কেটে পানি নামাচ্ছেন, আবার কেউ পানিতে ডুবে থাকা তরমুজ তুলে শুকনো স্থানে রাখছেন। বরগুনার লাকুরতলা গ্রামের চাষি আবদুর রব মিয়া জানান, ছয় একর জমিতে চার লাখ টাকা খরচ করেও তিনি তরমুজ বিক্রি করতে পারছেন না। তার খেতে প্রায় ১৩ হাজার তরমুজ পড়ে আছে, কিন্তু পানিতে ডুবে থাকায় ব্যবসায়ীরা কিনতে চান না। বরগুনা জেলায় এ বছর ১২,৩২৪ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছে, যার প্রায় অর্ধেক সদর উপজেলায়।

বরগুনার কৃষক আলম হাওলাদার জানান, তিনি ঋণ, এনজিও কিস্তি এবং স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে তরমুজ চাষ করেছেন। কিন্তু পরিবহন ও ক্রেতা সংকটে তার স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। বৃষ্টি না হলে তার খেতের তরমুজ ১২-১৫ লাখ টাকায় বিক্রি হতো, কিন্তু এখন ঋণের কিস্তি শোধ নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

পটুয়াখালীতে প্রায় ৩৫,০৫৭ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭ হাজার হেক্টর বেশি। কিন্তু অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে বাজারে তরমুজের দাম পড়ে গিয়ে কৃষকরা লোকসানের মুখে পড়েছেন। কৃষক মোশাররফ মৃধা জানান, তিনি দেড় লাখ টাকা খরচ করে ন্যায্য দাম পাননি। এবার বাজারে চার গুণ বেশি তরমুজ আসায় দাম অনেক কমে গেছে এবং অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

দক্ষিণাঞ্চলে এ বছর তরমুজ উৎপাদন ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালেও বাজার ধস, পরিবহন সংকট, বৃষ্টি ও দামের পতনের কারণে কৃষকদের মধ্যে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে। উৎপাদনের আনন্দ এখন অনেক কৃষকের কাছে লোকসান ও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বরিশাল ফল আড়তদার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান জাকির বলেন, ঘাটে তরমুজ আনার পর আমরা সেগুলোর মান যাচাই করে দরদাম করে বিক্রি করি। আবার অনেকে আমাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে জমি চাষ করে। তারাও তাদের উৎপাদিত তরমুজ আমাদের কাছে নিয়ে আসে।

বরিশাল কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক এসএম মাহবুব আলম বলেন, আগে আমাদের ধারণা ছিল তরমুজ শুধু উত্তরাঞ্চলে হয়। কিন্তু ইদানীং আমাদের দক্ষিণাঞ্চলের চরগুলোতে, বিশেষ করে ভোলা ও পটুয়াখালী অঞ্চলে অনেক তরমুজ হয়। এখানে প্রায় বিশ লাখ মেট্রিক টন তরমুজ উৎপাদিত হয়। এখন পর্যন্ত যে উৎপাদন হয়েছে তার চেয়ে আরও বেশি উৎপাদন হবে বলে আমরা আশাবাদী। তবে কৃষকের ক্ষতির কথা চিন্তা করে আমরা প্রণোদনা দেওয়ার জন্য কাজ করতেছি।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram