

বাগাতিপাড়া (নাটোর) প্রতিনিধি: নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এক ধরনের অভিনব কৌশল ব্যবহার করে গাছ নিধনের ঘটনা সামনে এসেছে। প্রকাশ্যে গাছ কাটতে না পেরে রাতের অন্ধকারে গাছের ছাল কেটে ও গর্ত করে ধীরে ধীরে গাছ মেরে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। এতে অর্ধশতাধিক বড় বড় গাছ ইতোমধ্যে শুকিয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গাছ কেটে নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় কেউ কেউ পরিকল্পিতভাবে এই পদ্ধতি ব্যবহার করছে। এতে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল। তারা বলছেন, গাছ শুধু কাঠের উৎস নয়, এটি পরিবেশ ও মানুষের জীবনের অন্যতম রক্ষাকবচ। তাই পরিকল্পিতভাবে গাছ ধ্বংসের এই প্রবণতা বন্ধে দ্রুত তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার পৌরসভার লক্ষণহাটী, জামনগর ইউনিয়নের বাজিতপুর থেকে রহিমানপুর ও কালিকাপুর সড়কের পাশে এবং রহিমানপুর গোরস্থান সংলগ্ন এলাকায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। এছাড়া সদর ইউনিয়নের কসবা এলাকাতেও একইভাবে গাছ নষ্ট করার ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে। বড় বড় কড়ই জাতের গাছের গোড়া থেকে প্রায় ৩–৪ ফুট পর্যন্ত ধারালো অস্ত্র দিয়ে ছাল তুলে ফেলা হয়েছে। কোথাও আবার গাছের চারপাশে রিং আকৃতিতে ছোট ছোট গর্ত করা হয়েছে। ফলে গাছগুলো ধীরে ধীরে শুকিয়ে মারা যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, যাদের বাড়ির সামনে বা ফসলি জমির পাশে রাস্তার ধারে বড় গাছ রয়েছে, তাদের মধ্যেই কেউ কেউ গাছ সরিয়ে ফেলার উদ্দেশ্যে এই পদ্ধতি অবলম্বন করছেন। কারণ এসব গাছ সরকারি জমিতে থাকায় প্রকাশ্যে কাটার সুযোগ নেই। তাই রাতের অন্ধকারে গাছের ছাল কেটে ধীরে ধীরে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, একটি পূর্ণবয়স্ক কড়ই গাছের মূল্য প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা হতে পারে। তবে অর্থমূল্যের চেয়েও একটি গাছ বহু বছর ধরে পরিবেশ রক্ষা করে, ছায়া দেয় এবং পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। এভাবে পরিকল্পিতভাবে গাছ ধ্বংস করা হলে পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।ৎ
রহিমানপুর এলাকার মাঠে কাজ করা কয়েকজন কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গাছগুলোকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যেই রাতের অন্ধকারে ছাল কেটে দেওয়া হয়েছে। সবাই বিষয়টি জানলেও কেউ প্রকাশ্যে বলতে চাইছেন না। তবে সঠিক তদন্ত করলে দোষীদের খুঁজে বের করা সম্ভব বলে তারা মনে করেন।
জামনগর ইউনিয়নের স্থানীয় মেম্বার মজিদ আলী জানান, বিষয়টি তিনিও কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছেন। যারা এ কাজ করেছে তারা অন্যায় করেছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ফেডারেশন (বিবিসিএফ) এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সবুজ বাংলার সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বী বলেন, রাস্তার পাশের বড় গাছগুলো পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ও জলবায়ুর ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পরিকল্পিতভাবে গাছের ছাল কেটে বা গর্ত করে ধীরে ধীরে মেরে ফেলা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রশাসন ও বন বিভাগের দ্রুত তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষকে সচেতন হয়ে এসব গাছ রক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
উপজেলা বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবিএম আব্দুল্লাহ জানান, সরকারি জমি বা রাস্তার পাশের গাছ ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, গাছ পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে গাছ নষ্ট করে থাকলে তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

