ঢাকা
১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ১০:৫০
logo
প্রকাশিত : মার্চ ৮, ২০২৬

‘খবরওয়ালা’র খবর আর সাইকেলের টুংটাং শব্দ চিরতরে থেমে গেছে

আবিদ হাসান, হরিরামপুর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি: খবরওয়ালা’র খবর আর সাইকেলের টুংটাং শব্দ চিরতরে থেমে গেল। পরিচিত সেই টুংটাং শব্দ আর চিরচেনা সেই মুখটি আর হয়তো দেখা যাবে না। মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার অতি পরিচিত শব্দ ছিল একটি সাইকেলের টুংটাং। সেই শব্দে নতুন পুরাতন খবরের পাতায় অনেকের নতুন দিনের শুরু হতো। সেই পরিচিত শব্দের পরিচিত মানুষটি সবার প্রিয় ‘খবরওয়ালা’ সুভাষ সাহা অন্তিম চিরযাত্রায় নীরব হয়ে গেলেন।

গত শনিবার (৭ মার্চ) দুপুরে নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা অসুস্থতায় ভুগছিলেন সুভাষ সাহা। মৃত্যুকালে তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন।

প্রায় ৩৫ বছর ধরে তিনি হরিরামপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পত্রিকা সরবরাহ করতেন। প্রতিদিন ভোর হওয়ার আগেই কাঁধে পত্রিকার বোঝা আর জংধরা পুরনো সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন হাট ঘাট মাঠে। শীত কুয়াশার সকাল, ঝড়, বৃষ্টি, রোদ, কিংবা গরম, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রচণ্ড গরম কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। মানুষের দোরগোড়ায় দিনের প্রথম খবর পৌঁছে দেওয়াই ছিল তার নিত্যদিনের দায়িত্ব, আর সেই দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন অগাধ নিষ্ঠা ও ভালোবাসা দিয়ে।

গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ, বাজারের মোড়, চায়ের দোকান কিংবা বাড়ির বারান্দা—সবখানেই ছিল তার পরিচিতি আর স্বরূপ উপস্থিতি। স্থানীয়দের কাছে তিনি শুধু একজন পত্রিকার হকারই ছিলেন না; ছিলেন সবার আপনজন, প্রতিদিনের পরিচিত এক মুখ।

নিয়মিততা ও আন্তরিকতার কারণে তিনি এলাকাবাসীর কাছে হয়ে ওঠেন ‘খবরওয়ালা’। অনেকেই বলেন, ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে তার সাইকেলের ঘণ্টার টুংটাং শব্দ শুনলেই বোঝা যেত নতুন দিন শুরু হয়েছে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদ পাওয়ার মাধ্যম বদলেছে। মানুষের হাতে এসেছে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট। তবুও পুরোনো সাইকেল আর কাঁধেভরা পত্রিকা নিয়েই নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন সুভাষ সাহা। কারণ তার কাছে এই কাজ ছিল শুধু পেশা নয়; ছিল মানুষের সঙ্গে এক গভীর সম্পর্কের বন্ধন।

তার মৃত্যুর খবরে হরিরামপুরজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আবেগঘন পোস্ট দিয়ে স্মরণ করছেন তাকে।

হরিরামপুর তথা মানিকগঞ্জ জেলার তরুণ প্রজন্মের বাতিঘর হিসেবে পরিচিত, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (দিনাজপুর) তৈয়বুল আজহার নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে লেখা হয়েছে, “চলে গেলেন সুভাষ দা। পর্দা নামলো একটি অধ্যায়ের। স্কুলে পড়াকালে তিনি ছিলেন আমার অন্যতম কাঙ্ক্ষিত মানুষ। আমি অপেক্ষায় থাকতাম, কখন তার পুরোনো জংধরা সাইকেল এসে হাজির হবে, আর আমি পত্রিকা হাতে নিয়ে হুমড়ি খেয়ে খেলার পাতায় চোখ রাখব। তিনি আমাদের প্রিয় সুভাষ সাহা দাদা। প্রায় ৩৫ বছর ধরে হরিরামপুর উপজেলায় সংবাদপত্র বিলি করেছেন। ‘পেপারলেস’ আগামীর ইন্টারনেট দুনিয়ায় সুভাষ দার মতো তাঁর পেশাও হয়তো গল্প হয়ে বেঁচে থাকবে। আপনি অন্য কারো মনেও হয়তো থাকবেন, কিন্তু আমার মনে আজীবন থাকবেন দাদা। বিদায়। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, শোক এবং স্যালুট।”

মুনশী সোহাগ নামের একটি আইডি থেকে লেখা হয়েছে, “আহা সুভাষ দা, আপনার সঙ্গে যেন আমাদের এক আত্মার সম্পর্ক ছিল। আপনাকে মনে থাকবে সবসময়। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।”

খালেক রাসেল নামের একটি আইডি থেকে লেখা হয়েছে, “ছোটবেলায় তিনি নিয়মিত আমাদের বাড়িতে পত্রিকা দিয়ে যেতেন। আমার ইংরেজি শেখার জন্য আব্বু তাকে বলে দিতেন, যেন বাংলার সঙ্গে একটি করে ইংরেজি পত্রিকাও দিয়ে যায়। চাহিদা কম থাকায় নিয়মিত আনতে পারতেন না, মাঝে মাঝে ইংরেজি পত্রিকা নিয়ে আসতেন। আব্বু চলে যাওয়ার পর আর বাড়িতে পত্রিকা রাখা হয়নি। এরপর রাস্তাঘাটে হঠাৎ তার সঙ্গে দেখা হতো। ছোটবেলার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে তার সঙ্গে—তার সাইকেল থেকে নামা, সাইকেল স্ট্যান্ড করা, ক্যারিয়ার থেকে পেপার বের করে হাতে দিয়ে আবার চলে যাওয়া। দৃশ্যগুলো এখনো মনে পড়ছে। তিনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। অবিরাম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তার প্রতি।”

স্থানীয় সাংবাদিক শুভংকর পোদ্দার জানান, কয়েক মাস ধরে তিনি বেশ অসুস্থ ছিলেন। তিন-চার মাস ধরে পত্রিকা দিতে পারেননি। কয়েক মাস আগে শেষবার রিকশায় করে পত্রিকা বিতরণ করেছিলেন। বর্তমানে তার দায়িত্ব আরেকজনের কাছে দিয়ে গেছেন।

উল্লেখ্য, একজন সাধারণ মানুষ হয়েও মানুষের হৃদয়ে অসাধারণ জায়গা করে নিয়েছিলেন সুভাষ সাহা। মানুষের ঘরে ঘরে খবর পৌঁছে দেওয়া এই নিরহংকারী মানুষটির স্মৃতি, তার সাইকেলের ঘণ্টার শব্দ আর ভোরবেলার সেই পরিচিত দৃশ্য দীর্ঘদিন ধরে বেঁচে থাকবে হরিরামপুরবাসীর হৃদয়ে।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram