ঢাকা
logo
প্রকাশিত : March 12, 2026

মিত্রদের পতনে পুতিন কখনও সরব, কখনও নিশ্চুপ

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হন ২৮ ফেব্রুয়ারি। পরের দিন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই ঘটনাকে একটি 'হত্যাকাণ্ড' এবং 'মানবিক নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক আইনের নির্লজ্জ লঙ্ঘন' বলে বর্ণনা করেন।

তবে কারা এটা ঘটিয়েছে, তা নিয়ে তিনি কিছুই বলেননি। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কাছে পাঠানো শোকবার্তায় পুতিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নামও উল্লেখ করেননি।

রাশিয়া আর ইরান ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একটি কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে, তবে ওই চুক্তি অনুযায়ী মস্কো সামরিক সহায়তা দিতে বাধ্য নয়।

গতবছর জুন মাসে যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোতে বোমা ফেলেছিল, তখন পুতিন সেটিকে ইরানের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ অপ্ররোচিত আগ্রাসন বলে অভিহিত করেছিলেন যার কোনও ভিত্তি বা যৌক্তিকতা নেই, তবে তখনও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কথা উল্লেখ করেননি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি খামেনিকে হত্যা করে, তাহলে কী হবে জানতে চাইলে পুতিন জবাব দেন, আমি এই বিষয়টি নিয়ে কথাই বলতে চাই না।

মস্কোর পাঁচটি মিত্র দেশের সরকার পতনের পরে ২০১১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে পুতিনের যেসব প্রকাশ্য বিবৃতি এসেছিল ক্রেমলিন আর রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে, সেগুলি পর্যালোচনা করেছে বিবিসির মনিটরিং বিভাগ।

দেখা যাচ্ছে, ভ্লাদিমির পুতিন অতীতে ওইসব সরকার পতনের জন্য কারা দায়ী এবং সেইসব সরকারের পতন কীভাবে হল, তা নিয়ে মুখ খুলেছিলেন, কিন্তু তার সাম্প্রতিক বিবৃতিগুলিতে তিনি সেসব বিষয়ে হয় কিছুই বলেননি, অথবা খুব কম উল্লেখ করেছেন।

গাদ্দাফি ও ইয়ানুকোভিচ: সুনির্দিষ্ট ওই ব্যক্তিগত বিবৃতি

লিবিয়ায় ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে মুয়াম্মার গাদ্দাফি নিহত হওয়ার পরে, পুতিন বিস্তারিত বিবৃতি দিয়েছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে আমেরিকার ড্রোন গাদ্দাফির গাড়িবহরকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল এবং উল্লেখ করেছিলেন যে বিদেশি স্পেশাল ফোর্স, যাদের সেখানে থাকার কথাই না।

তিনি ওই হত্যাকাণ্ডকে বিচার বা তদন্ত ছাড়াই নির্মূল হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন আর জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত প্রস্তাবকে "ক্রুসেডের জন্য মধ্যযুগীয় এক আহ্বান" বলে অভিহিত করেছিলেন।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট হিসাবে ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ যখন ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতাচ্যুত হন, তখন জোরালোভাবে মুখ খুলেছিলেন পুতিন।

এই প্রসঙ্গে ৪ মার্চ, ২০১৪ তারিখে একটি সংবাদ সম্মেলনে ভ্লাদিমির পুতিন পোল্যান্ড, জার্মানি এবং ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নাম উল্লেখ করেছিলেন, যারা সরকার এবং বিরোধী পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পন্ন করেছিলেন।

পুতিন প্রকাশ্যেই বলেছিলেন যে তিনি ইয়ানুকোভিচকে ক্রিমিয়া উপদ্বীপে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছিলেন।

পরবর্তী বছরগুলিতে ভ্লাদিমির পুতিন বারবার উল্লেখ করেছিলেন যে তার কথায়, ইউক্রেনের অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার সঙ্গে "বর্বর ও নির্লজ্জভাবে" প্রতারণা করা হয়েছে।

আসাদ: নিঃশব্দ পদক্ষেপ

যখন ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের গোড়ার দিকে বাশার আল-আসাদের শাসনের পতন ঘটে, তখন রাশিয়া তাকে মস্কোতে নিয়ে আসে, তবে পুতিন ওই ঘটনার প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়ায় নিন্দা করেননি বা দায়ীদের নামও নেননি।

বাশার আল-আসাদের মস্কোয় আসার প্রায় দুই সপ্তাহ পরে ভ্লাদিমির পুতিন সাংবাদিকদের বলেন যে সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তিনি এখনো দেখা করেননি। তিনি আরও দাবি করেন, সিরিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাবলির অর্থ এই নয় যে, রাশিয়া ব্যর্থ হয়েছে।

তবে ১৩ মাস পরে পুতিন সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ শারাকে দেশটির আঞ্চলিক অখণ্ডতা পুনরুদ্ধারের জন্য অভিনন্দন জানান।

মাদুরো: কোনো পদক্ষেপ বা বিবৃতি কিছুই নেই

এবছরের জানুয়ারি মাসে যখন মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেফতার করে এবং তাকে আমেরিকায় নিয়ে যায়, তখন পুতিন প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করেননি।

রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ, জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেনজিয়া, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা সহ বেশ কয়েকজন আইনপ্রণেতা অবশ্য ওই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছিলেন।

তবে ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

খামেনি: হত্যাকাণ্ড, তবে কারা দায়ী, তা নিয়ে নিশ্চুপ

নিকোলাস মাদুরোর গ্রেফতারে ঘটনা নিয়ে কিছু না বললেও খামেনির মৃত্যুতে ক্রেমলিন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল, কিন্তু ভ্লাদিমির পুতিন ঘটনার জন্য কারা দায়ী, তা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

কার্নেগি বার্লিন সেন্টারের একজন সিনিয়র ফেলো আলেকজান্ডার বাওনভের ব্যাখ্যা, এটা রাশিয়ার একাধিক রাজনৈতিক ভাষা।

রাশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হলো আমেরিকা-বিরোধী ভাষ্য তুলে ধরা, আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যাপারে ক্রেমলিনের নীতিটা আলাদা।

বাওনভ আরও বলেছেন যে ২০২০ সালে মার্কিন হামলায় আইআরজিসি কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি যখন নিহত হন, সেইসময়ে পুতিন বেসরকারিভাবে যে মন্তব্য করেছিলেন, তার থেকেও দুর্বল প্রতিক্রিয়া এসেছে খামেনির মৃত্যুর পরে।

সে সময়ে তিনি বলেছিলেন, ওরা গিয়ে একজন ইরানি জেনারেলকে হত্যা করল, তাদের মস্তিষ্ক বিকৃতি হয়েছে।

তবে তখনও ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করেননি পুতিন।

নির্বাসিত সাংবাদিক একাতেরিনা কোত্রিকাদজে বলছেন যে ভ্লাদিমির পুতিন একটি কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছেন: তিনি আগের মতো প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে আক্রমণ করতে পারছেন না, তবে নীরবতাও দুর্বলতার অন্যতম লক্ষণ।

তার কথায়, একের পর এক তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের পতন হচ্ছে, যা পুতিনের কাছে বেদনাদায়ক। কিন্তু তিনি জবাব দিতে পারছেন না কারণ ক্রেমলিন এখনও যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্টের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতার আশা দেখছেন।

ক্রেমলিনের 'সতর্ক' প্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলেকজান্ডার মোরোজভ বলেন, পুতিনের সমর-পদ্ধতি যে কতটা অচল, তা প্রকাশ হয়ে গিয়ে ক্রেমলিনকে এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছে ইরানের যুদ্ধ।

পুতিন সতর্ক অবস্থান নেওয়ার একটি কারণ হতে পারে যে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে তিনি ব্যক্তিগতভাবে হুমকি বোধ করছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক সের্গেই শেলিনের মতে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট এখন ট্রাম্পকে ভিন্নভাবে দেখেন এবং তার নিজের সন্দেহের স্বভাব আছে বলেই এই পরিস্থিতিকে "ক্রমবর্ধমান ভীতি"র সঙ্গে বিবেচনা করছেন।

মার্কিন সিনেটর জন ম্যাককেইন ২০১১ সালে বলেছিলেন যে ভ্লাদিমির পুতিনের গাদ্দাফির মতো একই পরিণতি হতে পারে। পুতিন জবাবে তার মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

এ ধরনের বক্তব্য এখন আর যুক্তরাষ্ট্র দেয় না। তবে পুতিনের প্রতিক্রিয়া সরাসরি অভিযোগ তোলার থেকে এখন এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে তিনি আর কারও নামই উল্লেখ করেন না।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram