ঢাকা
১১ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
বিকাল ৪:৩০
logo
প্রকাশিত : জুলাই ২৪, ২০২৫

‘বাংলাদেশি’ সন্দেহ হলেই ভারতীয় বাঙালিদের আটক করছে পুলিশ

অবৈধ বাংলাদেশি নাগরিক সন্দেহে ভারতের বাংলা ভাষাভাষী নাগরিকদের গণহারে আটক করছে দেশটির পুলিশ। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম বাঙালিদের আটক করে অস্থায়ী শিবিরে আটকে রাখা হচ্ছে। সেখানে তাদের নির্যাতন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অন্তত ৬ জন ভুক্তভোগী।

গত কয়েক মাস ধরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অবৈধ বাংলাদেশিদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া চলছে।

রাজস্থান, গুজরাত, ছত্তিশগড়, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ ও ওড়িশায় অবৈধ বাংলাদেশি চিহ্নিত করতে গিয়ে ভারতের বাংলাভাষীদেরও আটক করা হচ্ছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই মুসলমান, তবে হিন্দুদেরও আটক করা হচ্ছে। আবার এরকম ঘটনাও সামনে এসেছে যে, পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও তাকে বাংলাদেশে পুশ আউট করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিনের মতোই গত শনিবার (১৯ জুলাই) কাগজ-ভাঙা বোতল কুড়াতে রাজধানী দিল্লি লাগোয়া গুরুগ্রামের রাস্তায় ঘুরছিলেন পাথর আলি শেখ।

আদতে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার বাসিন্দা পাথর আলি শেখ অনেক বছর ধরেই গুরুগ্রামে ভাঙারির কাজ করেন। তিনি বলেন, সেদিন হঠাৎই একটা পুলিশের গাড়ি থেকে আমাকে ডাকল, কাগজপত্র কী আছে দেখতে চাইল। আমরা তো নোংরা ঘাঁটাঘাঁটি করি, আধার, ভোটার কার্ডের মতো মূল্যবান জিনিস কি আর সঙ্গে থাকে! আমরা তো ফোনও রাখি না কাজের সময়ে। কাগজ দেখাতে পারিনি বলে পুলিশের সাহেব আমাকে বলল গাড়িতে বোস।

আমরা বললাম কেন স্যার গাড়িতে বসতে বলছেন? তো বলে থানায় চল, কাজ আছে। পাথর আলি শেখ বলেন, আমাদের নিয়ে গেল সেক্টর ৪৩ থানায়। সেখানে আমার মতো ১০ জনকে এনেছিল। আমাদের বলল পরিচয় যাচাই করা হবে আমাদের দেশ-বাড়ি যে থানায়, সেখান থেকে। সব নাম ঠিকানা নিয়ে রাতে আবার চালান করে দিল সেক্টর ১০এ-তে।

একটা কমিনিউটি হলে রাখা হলো। সেখানে প্রচুর মানুষ– সবাইকে একইভাবে ধরে এনেছে। পাথর আলি জানান, সেখানে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের পাশাপাশি আসামের লোকও ছিল। সবাই বাঙালি। অনেক লোক গাড়িতে করে নিয়ে আসছিল পুলিশ। দেখে খুব ভয় পেয়েছিলেন তিনি যে বাঙালিদের এভাবে কেন অ্যারেস্ট করছে! সেখানে তারা মোট ৭৪ জন ছিলেন। তার বাড়ি নদীয়া জেলার যে এলাকায়, সেই নবদ্বীপ থানার ওসি পাথর আলির সব পরিচয়পত্র যাচাই করে একটি চিঠি গুরুগ্রাম পুলিশের কাছে পাঠানোর পরে বুধবার দিবাগত রাত ১টার দিকে পাথর আলি শেখ ছাড়া পেয়েছেন।

তার প্রশ্ন, ‘আমি তো ভারতীয়। সব কাগজ তো দেখিয়েছিলাম। তবুও আমাকে চার দিন আটকিয়ে রাখল ‘ তার সঙ্গে মোট ২৬ জনকে ছাড়া হয়েছে, তবে এখনো কয়েকজন সেখানে আটক আছেন বলে জানান পাথর আলি শেখ।

গুরুগ্রামের বহু বাংলাভাষীকেই এভাবে পুলিশ আটক করছে বলে জানিয়েছেন সেখানকার এক শ্রমিক সংগঠক মুকুল হাসান শেখ। তিনি বলেন, আমি গুরুগ্রামের আট-দশটা সেক্টরে ঘুরে দেখছি আসাম আর পশ্চিমবঙ্গের বহু বাঙালি মানুষদের ধরা হচ্ছে। কাজের জায়গা থেকে তুলে আনছে অনেককে। কোনো কথাবার্তা কিছু নেই, তুলে নিয়ে যাচ্ছে নাকি ভেরিফিকেশন করবে! আমরা বলছি যে ভেরিফিকেশন করার তো সেটা কর। নেট দিয়ে ভেরিফাই করতে কতক্ষণ আর লাগে! কিন্তু কাউকে দুই-তিন এমনকি ছয়দিন পর্যন্ত আটক রাখবে কেন!

তিনি আরো বলেন, এর মধ্যে আবার মুসলমানদের বেছে বেছে আটক করছে। একই জেলার বাসিন্দা হিন্দু পদবি শুনে তার আধার কার্ড দেখে ছেড়ে দিচ্ছে। কিন্তু মুসলমান হলেই তাকে থানায় নিয়ে যাচ্ছে, সেখান থেকে ওই কমিউনিটি হলে আটকিয়ে রাখছে। আবার আসামের মানুষরা যখন এনআরসি-র নথি দেখাচ্ছে, সেগুলোকেও জাল নথি বলছে পুলিশ। এর আগে গুরুগ্রামে অন্তত ছয়জন পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দাকে বাংলাদেশি সন্দেহ করে আটক করে শারীরিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে বলে তাদের পরিবার অভিযোগ করেছে। মুকুল হাসান শেখ বলছিলেন, বহু মানুষকে এভাবে আটক করায় আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে গুরুগ্রামের পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে।

যেখানে পাথর আলি শেখকে আটকিয়ে রাখা হয়েছিল, গুরুগ্রামের সেক্টর ১০ এ-র কমিনিউটি হলে অস্থায়ী আটক শিবিরে দিন কয়েক আগে প্রায় ২০০ জনকে দেখতে পেয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুপান্থ সিনহা।

তিনি বলেন, ওই সেন্টারে শুধু গুরুগ্রামের ওয়েস্ট জোন থেকে যাদের আটক করেছে, তাদের রাখা হচ্ছে। এরকম অন্যান্য জোনেও অস্থায়ী শিবির করা হয়েছে বলে শুনেছি, কিন্তু আমি নিজে সেইসব জায়গায় যাইনি। খুবই অমানবিক, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তিন-চার দিন ধরে আটক রাখা হয়েছে এদের। পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হচ্ছে না।

পরিচয়পত্রের নথি যাচাইয়ের জন্য এভাবে কাউকে আটকিয়ে রাখা বেআইনি বলে জানাচ্ছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুপান্থ সিনহা। তিনি বলেন, প্রথমে তো আমাদেরও ওই কমিউনিটি সেন্টারে ঢুকতে দেয়নি। তখন আমরা থানায় যাই। সেখানে পুলিশ আমাদের বলে যে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো নির্দেশ আছে যে পরিচয়পত্র যাচাই করতে হবে। এরকম কোনো লিখিত নির্দেশ প্রকাশিত হয়েছে বলে তো আমরা জানি না, পুলিশও দেখায়নি। তবে মৌখিকভাবে তারা আমাদের বলেন যে ওই নির্দেশেই নাকি রয়েছে কাউকে বাংলাদেশি বলে সন্দেহ হলে তাকে নাকি ৩০ দিন পর্যন্ত আটক করে রাখা যাবে। এরকম নির্দেশ যদি সত্যিই দেওয়া হয়ে থাকে, তা যেমন বেআইনি, তেমনই সংবিধানের লঙ্ঘনও।

অন্যদিকে আটক রাখার কথা গুরুগ্রাম পুলিশ অস্বীকার করেনি, তবে তারা জানিয়েছে পরিচয় যাচাই করে ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ পাওয়ার পরেও কাউকে আটক রাখা হয়েছে–– এমন ঘটনা তাদের জানা নেই।

গুরুগ্রাম পুলিশের জনসংযোগ অফিসার সন্দীপ তুরান বলেন, ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ হওয়ার পরেও কাউকে আটক করে রাখা হয়েছে, এরকম তথ্য আমার কাছে নেই। যদি আপনাদের কাছে কোনও নির্দিষ্ট তথ্য থাকে যে পরিচয়পত্র যাচাই করে ভারতের নাগরিকত্বের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে, তবু আটকে রাখা হয়েছে, তাহলে আমাদের জানান।

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram