

সোহেল তালুকদার, শান্তিগঞ্জ (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: পরমাণু বিজ্ঞানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করা বাংলাদেশি বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. শেখ আব্দুল লতিফ। দীর্ঘ গবেষণা, আন্তর্জাতিক শিক্ষকতা এবং বৈজ্ঞানিক অবদানে সমৃদ্ধ তাঁর কর্মজীবন। এবার সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে (সুবিপ্রবি) এগিয়ে নেওয়ার প্রাথমিক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁর মেধা, অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতারও সাক্ষী হয়েছে নতুন এ বিশ্ববিদ্যালয়।
২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক ড. শেখ আব্দুল লতিফ। বিশ্ববিদ্যালয়ের একেবারে শুরুর দিকের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে একাডেমিক কার্যক্রম, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ গড়ে তুলতে তিনি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন। দুই বছর দায়িত্ব পালনে তাঁর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রশংসিত হয়েছে।
একজন বিজ্ঞানীর কর্মজীবনের ব্যাপ্তি কতটা আন্তর্জাতিক হতে পারে, অধ্যাপক ড. শেখ আব্দুল লতিফ তার উজ্জ্বল উদাহরণ। জাপানের খ্যাতনামা টোকিও মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব সায়েন্স থেকে উল্কাপিণ্ডের গঠন নির্ণয়ে নিউক্লিয়ার প্রযুক্তির প্রয়োগ নিয়ে গবেষণা করে অর্জন করেছেন ডি.এসসি. (Doctor of Science) ডিগ্রি। পরবর্তীতে একই দেশের ল্যাবরেটরি অব রেডিওআইসোটোপ রিসার্চ সেন্টারে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণাও করেন।
পরমাণু শক্তি কমিশনে ২৫ বছরের বৈজ্ঞানিক জীবন
১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনে যোগ দেন অধ্যাপক ড. শেখ আব্দুল লতিফ। দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছরের কর্মজীবনে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা থেকে ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং সর্বশেষ প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (INST), অ্যাটমিক এনার্জি রিসার্চ এস্টাবলিশমেন্টসহ কমিশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে কাজ করেছেন।
২০১৮ সালে প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদ থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন তিনি। তবে অবসরের পর থেমে থাকেননি গবেষণা ও শিক্ষকতা। তাঁর বৈজ্ঞানিক কর্মপরিধি ছড়িয়ে পড়ে দেশের সীমানার বাইরেও।
সৌদি আরবে আন্তর্জাতিক শিক্ষকতা
২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রেষণে সৌদি আরবের কিং আব্দুল আজিজ ইউনিভার্সিটি (KAU), জেদ্দা-তে শিক্ষকতা করেন তিনি। পরবর্তীতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ এবং সেন্টার ফর ট্রেনিং অ্যান্ড রেডিয়েশন প্রোটেকশনে শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
নিউক্লিয়ার ফিজিক্স, নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর ফিজিক্স, মেডিকেল ও হেলথ ফিজিক্স, রেডিয়েশন প্রোটেকশন, ইলেকট্রনিক্স এবং এক্সপেরিমেন্টাল টেকনিকস তাঁর পাঠদানের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
গবেষণায় বিস্তৃত অবদান
পরিবেশগত নমুনার মৌলিক বিশ্লেষণ, নিউট্রন অ্যাক্টিভেশন অ্যানালাইসিস, ফোটন অ্যাক্টিভেশন অ্যানালাইসিস, গবেষণা রিঅ্যাক্টরের মাধ্যমে নিউক্লিয়ার ডেটা পরিমাপ, পরিবেশগত তেজস্ক্রিয়তা নির্ণয় এবং খাদ্যদ্রব্যে তেজস্ক্রিয়তা পর্যবেক্ষণসহ নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কাজ করেছেন তিনি।
উচ্চ-রেজোলিউশনের HPGe detector ব্যবহার করে পরিবেশগত তেজস্ক্রিয়তা নির্ণয় এবং গামা-রে স্পেকট্রোস্কোপির মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্যে তেজস্ক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ তাঁর গবেষণার উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র।
সৌদি আরবে অবস্থানকালে কৃষিজমির মাটি, সার ও কৃষিপণ্যে প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয়তা পরিমাপ এবং মানববিহীন চন্দ্রযানের অবতরণপথ নির্ধারণে HUAPO Technique নামে Hybrid Approach নিয়ে গবেষণাও করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক জার্নালে ৩৯ গবেষণাপত্র
অধ্যাপক ড. শেখ আব্দুল লতিফের গবেষণাকর্মের পরিধিও বিস্তৃত। আন্তর্জাতিকভাবে স্বনামধন্য জার্নালে তাঁর ৩৯টি গবেষণাপত্র, জাতীয় জার্নালে ১৬টি গবেষণাপত্র, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ২টি প্রবন্ধ, আন্তর্জাতিক কনফারেন্স/সিম্পোজিয়াম/মিটিংয়ে ১১টি অ্যাবস্ট্রাক্ট এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রকাশিত ২টি রিপোর্ট রয়েছে।
বিজ্ঞান ও গবেষণার পাশাপাশি সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও রয়েছে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের রিটায়ার্ড সায়েন্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনবার নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। বাংলাদেশ ফিজিক্যাল সোসাইটি ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল সোসাইটিরও আজীবন সদস্য অধ্যাপক ড. শেখ আব্দুল লতিফ।
সুবিপ্রবির জন্য নিবেদিত দুই বছর
সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও একাডেমিক পরিবেশ গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অধ্যাপক ড. শেখ আব্দুল লতিফের মতো একজন আন্তর্জাতিক গবেষক ও অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদের সম্পৃক্ততা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
২০২৪ থেকে ২০২৬—এই দুই বছরে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও প্রক্টর হিসেবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যে সময়, শ্রম ও মেধা দিয়েছেন, তা প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা এখনও শৈশব পেরোচ্ছে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি নির্মাণে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন বিজ্ঞানীর শ্রম ও মেধার সংযোজন নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। পরমাণু বিজ্ঞানে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা এই বিজ্ঞানীর অভিজ্ঞতা ও গবেষণালব্ধ জ্ঞান ভবিষ্যতে সুবিপ্রবির শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।
সুনামগঞ্জের মাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর উচ্চশিক্ষার যে নতুন দ্বার খুলেছে, সেই পথচলার প্রাথমিক অধ্যায়ে অধ্যাপক ড. শেখ আব্দুল লতিফের অবদান তাই শুধু একটি দায়িত্ব পালনের ঘটনা নয়; বরং সুবিপ্রবির ইতিহাসে একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানীর নিবেদিত অধ্যায়ের নাম।
