

তিন দশকের বেশি সময় ধরে পরিকল্পনা আর নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোলেও এখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি রাজধানীর বহুল আলোচিত ইস্টার্ন বাইপাস রোড (ইস্টার্ন ইনার সার্কুলার রোড)। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর কেন্দ্রনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থার চাপ কমানো, পূর্ব ঢাকার সঙ্গে উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং জলাবদ্ধতা মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সর্বশেষ পরিকল্পনায় ২৮ কিলোমিটার এলিভেটেড সড়ক নির্মাণে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পূর্ব ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের পাশাপাশি এ অঞ্চলের পরিকল্পিত নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসতে পারে।
বদলেছে পরিকল্পনার ধরন : প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় রাজধানীর বড় অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর পূর্বাঞ্চলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পাশাপাশি একটি সমান্তরাল সড়ক নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। পরে জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকা ও বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় টঙ্গী থেকে পূর্বাচল হয়ে ডেমরা পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও বাইপাস সড়ক নির্মাণের সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে ঢাকার বিশদ এলাকা পরিকল্পনায় (ড্যাপ) করিডরটি ইস্টার্ন ইনার সার্কুলার রোড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে মস্তুল, ডুমনি, তলনাসহ কয়েকটি মৌজায় জমি অধিগ্রহণও করা হয়।
২০২০ সালে প্রকল্পটি পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতায় আসে। একই সময়ে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করে।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ সমীক্ষা অনুযায়ী, ২৮ কিলোমিটার এলিভেটেড সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে জমি অধিগ্রহণে। বিপুল ব্যয় ও বাস্তবায়নের জটিলতার কারণে প্রকল্পটি এখনো চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়।
সড়ক পরিবহন, সেতু বিভাগ ও রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, ‘ইস্টার্ন বাইপাস রোড বা ইনার সার্কুলার রোড প্রকল্পকে একটি আঞ্চলিক যোগাযোগ করিডর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সড়কটি ঢাকার পূর্বাঞ্চল ঘুরে এমন একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করবে, যার মাধ্যমে উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের যানবাহন ঢাকায় প্রবেশ না করে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে।’
তিনি বলেন, ‘এ প্রকল্প বাস্তবায়নের সুফল শুধু যানজট নিরসন বা দ্রুত যোগাযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পূর্ব ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মানও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে। সরকার প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিচ্ছে।’
গুরুত্বপূর্ণ ইস্টার্ন বাইপাস : বর্তমানে রাজধানীর সড়কব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা হলো শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে কেন্দ্রীয় এলাকার ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে রাজধানীর ভেতরে যাদের গন্তব্য নেই—এমন যানবাহনকেও ব্যস্ত কেন্দ্রীয় সড়ক ব্যবহার করতে হয়। এতে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। বিশেষ করে বিমানবন্দর সড়ক ও প্রগতি সরণিতে যানবাহনের চাপ বেশি। এ দুটি সড়ক দিয়ে রাজধানীর পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক বাসযাত্রী পরিবহন করে। আবার রাত ৯টার পর ট্রাক ও লরির চাপ বাড়লে এসব সড়কে তীব্র যানজট তৈরি হয়।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘বিমানবন্দর, আব্দুল্লাহপুর, টঙ্গী, গাজীপুর ও উত্তরবঙ্গ থেকে আসা যানবাহনের একটি অংশকে পূর্বাঞ্চলীয় বিকল্প রুটে পরিচালনা করা গেলে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর ওপর চাপ কমবে। ইস্টার্ন বাইপাস শুধু একটি যোগাযোগ প্রকল্প নয়; এটি বন্যা নিয়ন্ত্রণের অবকাঠামো হিসেবেও কাজ করতে পারে। সড়কের সঙ্গে যথাযথ বাঁধ, কালভার্ট, স্লুইস, ড্রেনেজ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সমন্বিতভাবে নির্মাণ করা গেলে যোগাযোগের পাশাপাশি বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি মোকাবেলায়ও ভূমিকা রাখবে।’
আব্দুল্লাহপুর থেকে ডেমরা পর্যন্ত বিকল্প পথ : প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইস্টার্ন ইনার সার্কুলার রোড বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর উত্তর অংশের আব্দুল্লাহপুর থেকে ডেমরা পর্যন্ত একটি নিরবচ্ছিন্ন বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠবে। পূর্বাচল, বেরাইদসহ পূর্ব ঢাকার বিভিন্ন এলাকা এই করিডরের সঙ্গে যুক্ত হবে। এর ফলে বিমানবন্দর, আব্দুল্লাহপুর, টঙ্গী ও গাজীপুর থেকে আসা অনেক যানবাহনকে রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকার যানজটে ঢুকতে হবে না। একইভাবে উত্তরবঙ্গ থেকে আসা পণ্যবাহী যানও বিকল্প এই করিডর ব্যবহার করে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দিকে চলে যেতে পারবে। এ ছাড়া যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, আমুলিয়া ও রামপুরার সঙ্গে সংযোগের পাশাপাশি হাতিরঝিল, রামপুরা-বনশ্রী এবং বাসাবো-নন্দীপাড়ার বিদ্যমান সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে প্রকল্পটির সংযোগ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘রাজধানীর পশ্চিমাঞ্চলে একের পর এক ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে ও এলিভেটেড সড়ক নির্মিত হলেও পূর্বাঞ্চল তুলনামূলকভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়নে পিছিয়ে রয়েছে। রাজধানীর ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের জন্য পূর্বাঞ্চলে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। ইস্টার্ন ইনার সার্কুলার রোড শুধু একটি সড়ক নয়; এটি পূর্ব ঢাকার টেকসই নগর উন্নয়ন, বন্যা ব্যবস্থাপনা ও ভবিষ্যৎ যোগাযোগব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হতে পারে।’
কিছু কাজ এগোলেও অধরা মূল সড়ক : প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মূল সড়কের নির্মাণকাজ শুরু না হলেও প্রকল্প ঘিরে কিছু অবকাঠামোগত কাজ এরই মধ্যে হয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ টঙ্গী থেকে শাহ আলী মাজার পর্যন্ত প্রায় ১৭ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ উন্নয়ন করেছে। তুরাগ নদের তীর ঘেঁষে নির্মাণ করা হয়েছে ওয়াকওয়ে। এ ছাড়া প্রকল্পের জন্য বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তবে ডেলনা, তলনা ও পাতিরা এলাকায় ক্ষতিপূরণ পরিশোধ শেষ না হওয়ায় ওই অংশের অধিগ্রহণ কার্যক্রম এখনো ঝুলে আছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ডেমরা থেকে সরাসরি এক সড়কে টঙ্গী যাওয়া যাবে। এখনকার মতো মেরাদিয়া, রামপুরা হয়ে প্রগতি সরণির যানজট পোহাতে হবে না।
