

রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও সাভারে অবস্থিত গণবিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন। এর আগে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম লঙ্ঘন করে কমিটি ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। একইভাবে নিয়ম ভেঙে গণবিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (গকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এবং সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এজিএসকে) কে ছাত্র শিবিরের কর্মসূচিতে দেখা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, গণবিশ্ববিদ্যালয় নীতিমালা, গকসুর নীতিমালা ও গণবিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নীতি অনুযায়ী রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস থাকার কথা থাকলেও গত কয়েক বছরে সেই নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। আর এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নীরব রয়েছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের প্যাডে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে গণবিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের সংগঠনের শাখা কমিটি গঠনের বিষয়টি প্রকাশ করা হয়।
এতে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন তাওহীদ আহমদ সালেহীন এবং সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন জান্নাতুল ফেরদৌস রিয়া। কমিটির অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্তরা হলেন- সাংগঠনিক সম্পাদক নাহিদ ইসলাম, অর্থ সম্পাদক রত্না আক্তার এবং প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক এস এম নাজমুল ইসলাম শুভ। এ ছাড়া কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন তমাল চৌধুরী, রতন তালুকদার, শফিউল ইসলাম এবং সাজ্জাদ বাবর।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালায় শুরু থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। এমনকি ভর্তি ফরমে শিক্ষার্থীদের অঙ্গীকারনামার মাধ্যমেও দলীয় রাজনীতি থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে ‘রাজনীতি মুক্ত ক্যাম্পাস’ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি রয়েছে।
এ বিষয়ে গণবিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ফেডারেশনের নবগঠিত কমিটির সভাপতি তাওহীদ আহমদ সালেহীন বলেন, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন কোনো লেজুড়বৃত্তিক ছাত্রসংগঠন নয়। এটি সাম্যবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় জনগণের পক্ষের রাজনীতি করে আসছে। গণবিশ্ববিদ্যালয় শাখাও বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল বিধিবিধান ও নীতিমালার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে শান্তিপূর্ণ, দায়িত্বশীল ও গণতান্ত্রিক ধারায় তার কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবুল হোসেন বলেন, ‘‘ছাত্র ফেডারশনের কমিটি সম্পর্কে অবগত নই, সেক্ষেত্রে এ বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক দলের ব্যানারে কেউ কোনো কার্যক্রম বা কর্মসূচি করছে না।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গণবিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে ২০২৫ সালের ১২ জুন প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক সংগঠনের কমিটি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। তবে গত ১০ মাসে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংগঠনটির কার্যক্রম দেখা যায়নি।
তবে এর বাইরে আওয়ামী লীগ শাসনামলে কিংবা কখনো ছাত্রলীগ, শিবির কিংবা অন্যান্য সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও প্রকাশ্য কমিটি গঠন করা হয়নি। যদিও বিভিন্ন সময়ে কিছু সংগঠন ‘ভিন্ন নামে’ সীমিত আকারে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়েছে।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে দীর্ঘ দিন ধরে সক্রিয় ছিল বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন। সংগঠনটির সঙ্গে গণসংহতি আন্দোলনের সম্পর্ক রয়েছে। ছাত্র ফেডারেশন বিভিন্ন সময় কেন্দ্রীয়সহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মসূচিতে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মিলনায়তনও ব্যবহার করে বলে জানা যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিকিকরণের বিষয়ে বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের ৫ম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী আব্দুল মতিন পাভেল বলেন, অরাজনৈতিক ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার শিক্ষার পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা প্রয়োজন তবে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে পারে, যা প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। কর্তৃপক্ষের উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী নিরাপদ ও স্বাধীন শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর আদর্শকে ভিত্তি করে গণবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এ আদর্শ অক্ষুণ্ন রাখার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া অতীব জরুরি।
গণবিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাবেক সভাপতি বরাতুজ্জামান স্পন্দন বলেন, গণবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দলীয় রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জীবদ্দশায়, এমনকি তাঁর মৃত্যুর পরও কেউ প্রকাশ্যে দলীয় রাজনীতি করার সাহস দেখায়নি। অথচ এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ব্যানারে কমিটি গঠন ও প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে। এর ফলে ক্যাম্পাসে নিয়মিত সংঘর্ষ, অস্থিতিশীলতা, এমনকি ধর্ষণের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনাও ঘটছে। প্রশাসনের চরম অথর্বতা ও নীরব প্রশ্রয়েই প্রতিষ্ঠানের লিখিত নীতির পরিপন্থি এসব কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। এর ভয়াবহ পরিণতি শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদেরই বহন করতে হবে।
এ বিষয়ে গণবিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি ও ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর স্ত্রী শিরিন হকের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ছাত্র ফেডারেশনের কমিটির বিষয়ে জানেন না। অরাজনৈতিক ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে বিধিভঙ্গের কারণে কি শাস্তি হতে পারে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করেননি।
তবে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক ট্রাস্টি দিলারা চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, গণবিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল প্রকার রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা নিষিদ্ধ। সেক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে বা বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার করে কোন রাজনৈতিক সংগঠন কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইলে ট্রাস্টি বোর্ডের সিদ্ধান্ত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী তাদের নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে।
