ঢাকা
১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সকাল ৭:৫২
logo
প্রকাশিত : জানুয়ারি ১৯, ২০২৬

৪৫ হাজার কোটির অপচয় প্রকল্প

প্রাথমিকের শিক্ষার মান বাড়ানোর নামে তড়িঘড়ি করে ৪৫ হাজার কোটি টাকা অপচয়ের এক প্রকল্প নিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি-পিইডিপি-৪ শেষ না হতেই অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে বড় বাজেটের আরেকটি প্রকল্প নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। আগামী পাঁচ বছরে, বিদ্যমান উন্নয়ন প্রকল্পের বাইরে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানা গেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, পিইডিপি-৫ নামের এ প্রকল্পটির লক্ষ্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায্য, টেকসই ও উচ্চমানের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি শিশু শক্ত ভিত্তিগত সাক্ষরতা ও গণিতে দক্ষতা অর্জন করবে এবং একুশ শতকের প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিয়ে নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।

তবে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি), ব্যয় কাঠামো, অতীত অভিজ্ঞতা ও সাম্প্রতিক শিক্ষাগত সূচক বিশ্লেষণে প্রশ্ন উঠেছে—এই কর্মসূচি কি সত্যিই শেখার সংকট সমাধানে সক্ষম হবে, নাকি আগের ব্যয়বহুল ও ফলহীন প্রকল্পগুলোরই পুনরাবৃত্তি হবে?
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বড় ধরনের গাফিলতি আছে। প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু অবকাঠামো হচ্ছে শিশুরা কিছু শিখছে না। এই যে পিইডিপি-৫ আরএডিপি করার শেষ সময় পাঠিয়েছে। কোনো পরিকল্পনা নেই।

এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষায় দীর্ঘদিনের শেখার ঘাটতি দূর করা, বর্তমান ৯৪.৫৫ শতাংশ থেকে শতভাগ নিট ভর্তি নিশ্চিত করা, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী হার ৮৪ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশের বেশি করা এবং প্রায় দুই লাখ ঝরে পড়া বা স্কুলের বাইরে থাকা শিশুকে আবার শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় (মোপমে) এরই মধ্যে পিইডিপি-৫-এর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশন ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) পাঠিয়েছে। পরিকল্পনা বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি) তাদের সর্বশেষ বৈঠকে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) অনুমোদনবিহীন প্রকল্পের তালিকায় এই কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করার অনুমোদন দিয়েছে।

ডিপিপি অনুযায়ী, পিইডিপি-৫-এর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

এর মধ্যে সরকারি তহবিল প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা এবং বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আসবে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে। অর্থায়নের বড় অংশ বিশ্বব্যাংক ও এডিবির ঋণ, পাশাপাশি ইউনিসেফ, জাইকা, জিপিই, ইউনেসকো ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর বৈদেশিক ঋণের বোঝাও চাপবে।
ডিপিপিতে বলা হচ্ছে, পিইডিপি-৫-এর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণিতে বাংলায় ৭০ শতাংশ এবং গণিতে যথাক্রমে ৬০ ও ৫০ শতাংশ দক্ষতা অর্জন। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় শতভাগ ভর্তি, প্রাথমিক স্তরে নিট ভর্তি হার ১০০ শতাংশে উন্নীত করা, ঝরে পড়ার হার ১৬.২৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি হার ৮৭.৪৫ শতাংশ থেকে ৯৩ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।

কাগজে-কলমে এই লক্ষ্যগুলো উচ্চাভিলাষী হলেও বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। আগের চারটি পিইডিপিতেও প্রায় একই ধরনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু গত এক যুগে তৃতীয় ও চতুর্থ পিইডিপিতে প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা ব্যয় হলেও শেখার মানে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫ দেখিয়েছে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির অধিকাংশ শিক্ষার্থী পড়া ও গণিতে মারাত্মকভাবে পিছিয়ে আছে। জরিপে দেখা যায়, মাত্র ২৪ শতাংশ শিশুর প্রাথমিক পাঠ দক্ষতা রয়েছে এবং একটি ছোটগল্পের ৯০ শতাংশ শব্দ সঠিকভাবে পড়তে পারে মাত্র ৩৯ শতাংশ। মৌলিক ও অনুমানভিত্তিক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে প্রায় ৩০ শতাংশ শিশু। গণিতে চিত্র আরো উদ্বেগজনক। মাত্র ১৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর মৌলিক সংখ্যাজ্ঞান রয়েছে। যোগ-বিয়োগ করতে পারে ৩৬ শতাংশ এবং সংখ্যা পড়তে পারে মাত্র ৩১ শতাংশ।

এমন বাস্তবতায় পিইডিপি-৫-এর ব্যয় কাঠামো আরো উদ্বেগজনক। ডিপিপি বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিপুল অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রশাসনিক খাতে। সারা দেশে প্রায় ২৫ হাজার একক শিফট স্কুল বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। শিশুবান্ধব মানদণ্ড পূরণকারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হার ৭২.৫ শতাংশ থেকে ৯২ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। ওয়াশ সুবিধা, নিরাপদ পানির উৎস, বাউন্ডারি ওয়াল, ওয়াশ ব্লক ও নতুন ভবন নির্মাণে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। শুধু অবকাঠামো খাতে নন-রেসিডেনশিয়াল বিল্ডিং নির্মাণেই বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় সাত হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা।

অন্যদিকে শিক্ষাদানের গুণগত পরিবর্তনের জন্য যে খাতগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষভিত্তিক সহায়তা, শেখার ফলাফল মূল্যায়ন—সেগুলোর ফলাফল কাঠামো অস্পষ্ট। প্রাক‌-সার্ভিস শিক্ষক প্রশিক্ষণ হিসেবে ডিপ্লোমা ইন প্রাইমারি এডুকেশন (ডিপিইডি) চালুর কথা বলা হয়েছে, যেখানে সাত হাজার শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ নেবে। জাতীয় শিক্ষক সার্টিফিকেশন কর্তৃপক্ষ গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে আগের পিইডিপিতে প্রশিক্ষণ ও সিপিডি কাঠামো চালু থাকলেও শ্রেণিকক্ষে তার বাস্তব প্রতিফলন সীমিত ছিল—এই বাস্তবতা ডিপিপিতে যথাযথভাবে স্বীকার করা হয়নি।

ডিপিপিতে বিকেন্দ্রীকরণ ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে পরিকল্পনা শক্তিশালী করা, ১৯টি আঞ্চলিক অফিস স্থাপন এবং আইপিইএমআইএসের সঙ্গে অন্যান্য ডেটা সিস্টেমের আন্ত সংযোগ ঘটানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু পিইডিপি-৪-এর অভিজ্ঞতা বলছে, ডেটা থাকলেও তা ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। কেন্দ্রীয়ভাবে প্রকল্প চাপিয়ে দেওয়ায় স্থানীয় বাস্তবতা উপেক্ষিত থেকেছে।

সমতা ও অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নেও পিইডিপি-৫ আশ্বস্ত করতে পারছে না। পাহাড়ি অঞ্চল, চরাঞ্চল, শহরের বস্তি, প্রতিবন্ধী ও সংখ্যালঘু ভাষাভাষী শিশুদের জন্য বিশেষ কৌশলের কথা বলা হলেও বাজেট বরাদ্দে তার প্রতিফলন দুর্বল। অথচ এনএসএ ও এমআইসিএস দেখিয়েছে, দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের শিশুরাই শেখার সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।

পিইডিপি-৪-এর মূল্যায়নেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। অবকাঠামো ও ভর্তি বাড়লেও শেখার মানে উন্নতি হয়নি। প্রায় ১৬ শতাংশ অর্থ অব্যবহৃত থেকে গেছে। শিক্ষক সক্ষমতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শ্রেণিকক্ষভিত্তিক সহায়তার ঘাটতি রয়ে গেছে। তবু সেই ব্যর্থতার গভীর বিশ্লেষণ ছাড়া আরো বড় আকারে পিইডিপি-৫ নেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম মনে করেন, প্রাথমিক শিক্ষায় প্রশাসনিক বিষয়ে মনিটরিং থাকলেও একাডেমিতে কার্যকর মনিটরিংয়ের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, বিগত দেড় দশকে শিক্ষা খাতে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সেগুলোর বেশির ভাগ ছিল রাজনৈতিক বিবেচনায়। এ কারণে শিক্ষার্থীদের শিখনমান ও দক্ষতার প্রত্যাশিত উন্নয়ন ঘটেনি। বিভিন্ন প্রকল্পে ভবন নির্মাণ হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেনাকাটায় নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ফলে এসব প্রকল্প কার্যত শিক্ষার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারেনি।

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের জন্য শিক্ষকের সংখ্যা, যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ বাড়ানো দরকার। শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ ছাড়া শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন সম্ভব নয়। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষক সংখ্যা, যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ বাড়ানো প্রয়োজন।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +880 2-8878026, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram