

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার একটি পথ বা ‘অফ-র্যাম্প’ খুঁজতে মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন দেশটির জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ এই কর্মকর্তা মনে করছেন, ইরানে সামরিক অভিযান আরও বাড়ালে তা উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে এবং শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সূত্রগুলো জেনারেল কেইনের সাম্প্রতিক আলোচনা সম্পর্কে অবগত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে জেনারেল কেইন সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার সঙ্গে যুদ্ধের সামরিক বিকল্প ও সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
একটি সূত্র সিএনএনকে সরাসরি বলেছে, ‘কেইন একটি বের হওয়ার পথ খুঁজছেন।’
সূত্রগুলোর দাবি, সামরিক অভিযান আরও বাড়ানোর ক্ষেত্রে যেসব বিকল্প রয়েছে, সেগুলোর সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে কেইন অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের আগে প্রশাসনের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং একই ধরনের মূল্যায়ন নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এক সূত্রের ভাষ্য, কেইনের এই তৎপরতার অন্যতম কারণ হলো মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সুরক্ষা দেওয়া।
বিমান হামলার সীমাবদ্ধতা
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানোর বিষয়ে অনাগ্রহী। তিনি বরং বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানকে তার শর্তে সমঝোতায় বাধ্য করার সম্ভাবনার ওপর জোর দিয়ে আসছেন।
কিন্তু কেইনসহ ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে মনে করছেন, শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন। এ কারণে প্রেসিডেন্টের নির্ধারিত সীমার মধ্যে থেকে বিকল্প সামরিক ও কূটনৈতিক পথ খোঁজার চেষ্টা চলছে।
জেনারেল কেইন সম্প্রতি প্রকাশ্য এক শুনানিতেও বলেছেন, ‘এয়ারপাওয়ারের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’
যুদ্ধের প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার এমন অবস্থানকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ যুদ্ধের শুরুতে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ধ্বংস করার দাবি করা হলেও এখনো সংঘাতের অবসান ঘটেনি। একই সঙ্গে ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান ঘোষিত লক্ষ্য হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা।
নতুন হামলার পরিকল্পনা নিয়েও আপত্তি
জুলাইয়ের শেষ দিকে ইরানে আরও বড় ধরনের হামলা চালানোর একটি পরিকল্পনা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানায়, জেনারেল কেইনসহ কয়েকজন কর্মকর্তা ওই পরিকল্পনার সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে সতর্ক ছিলেন।
এক সূত্রের দাবি, ওই অভিযানের পক্ষে মূলত সেন্টকমের কিছু অংশ ছিল। ইসরায়েলও সংঘাত আরও বাড়ানোর একটি অভিযানের বিষয়ে ব্যাপকভাবে সমর্থন জানিয়েছিল।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মিত্রদেশের সঙ্গে কথা বলার পর ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত ওই হামলা থেকে সরে আসেন। মিত্রদেশগুলো ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা, বিশেষ করে তাদের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
তবে ওই পরিকল্পনা ভবিষ্যতে আবার বিবেচনা করা হতে পারে বলে প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
কমে আসছে মার্কিন অস্ত্রের মজুত
ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসাও মার্কিন সামরিক নেতৃত্বের উদ্বেগের অন্যতম কারণ।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, জেনারেল কেইন সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে অন্তত দুটি বৈঠকে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারের ক্রমহ্রাসমান মজুত নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারাও মার্কিন প্রশাসনকে জানিয়েছেন, উচ্চক্ষমতার মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি থাকলে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা ঠেকানো কঠিন হতে পারে।
ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দিয়ে আসছেন। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছে, এ ধরনের হামলা ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার বদলে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোয় ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
একইভাবে ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার বিষয়ও বিবেচনায় এসেছে। তবে সূত্রগুলোর মতে, এসব হামলা কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কও সামলাচ্ছেন কেইন
সিএনএনের সূত্রগুলো বলছে, সামরিক অভিযানের সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে চান না জেনারেল কেইন। তাই প্রেসিডেন্টের কাছে সামরিক বিকল্পগুলোর সম্ভাব্য নেতিবাচক দিক তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি সতর্কতা অবলম্বন করছেন।
সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প ও অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে এক বৈঠকে কেইন সামরিক অভিযানের সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং মার্কিন গোলাবারুদের ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরেন। তবে একই বৈঠকে তিনি এটিও স্পষ্ট করেন যে, প্রেসিডেন্ট অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিলে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ওপর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে সক্ষম।
ব্যক্তিগত আলোচনায় অবশ্য কেইন আরও সরাসরি বিমান শক্তির সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
যুদ্ধের আগে থেকেই সতর্ক করেছিলেন
যুদ্ধ শুরুর আগেও জেনারেল কেইনসহ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন যে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুতের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ইসরায়েল ও ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে তখন সতর্ক করা হয়েছিল।
এখন মার্কিন সামরিক কমান্ডারদের একটি অংশ মনে করছে, অস্ত্রের মজুত ‘বিপজ্জনকভাবে কম’ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এই পরিস্থিতিতে পেন্টাগন ও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড তাদের সামরিক কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করছে। এমনকি ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর নতুন ও প্রচলিত পদ্ধতি খুঁজতে সেন্টকমের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সামরিক সদস্যদের কাছ থেকে নতুন ধারণাও চেয়েছেন।
সূত্রগুলোর মতে, যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস পর নতুন করে বিকল্প খোঁজার বিষয়টি সংঘাতের বর্তমান পরিস্থিতি ভালো যাচ্ছে না—এমন একটি পরোক্ষ স্বীকৃতিও হতে পারে।
কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজা
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে এখন এমন একটি ‘অফ-র্যাম্প’ খোঁজার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা ট্রাম্পকে অন্তত একটি ‘প্রতীকী বিজয়’ দেখানোর সুযোগ দেবে এবং একই সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও নষ্ট করবে না।
এ ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে কোনো সমঝোতা একটি সম্ভাব্য সূচনা হতে পারে বলে সূত্রগুলো মনে করছে।
অর্থাৎ, ইরানে আরও বড় সামরিক অভিযান চালানোর পরিবর্তে এমন একটি পথ খোঁজা হচ্ছে, যাতে ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে বিজয়ের দাবি করতে পারেন এবং একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ঝুঁকিও কমানো যায়।
তবে মার্কিন সামরিক নেতৃত্বের কেউই বর্তমানে ইরানকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করতে বড় আকারের স্থল অভিযান চালানোর পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়নি। কারণ এমন অভিযানে কয়েক হাজার মার্কিন সেনার প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
