

সীমান্ত হেলাল, মনপুরা (ভোলা) প্রতিনিধি: ভোলার মনপুরায় ২৪ বছর ধরে ঝুঁকি নিয়ে উপজেলা পোস্ট অফিসের কার্যক্রম চলছে ভাড়া করা টিনশেডের ঝুপড়ি ঘরে। ২০২১ সালে পোস্ট অফিসের নতুন ভবনের কাজ শুরু হলেও অজানা কারণে ৫ বছরেও সম্পন্ন হয়নি এখনো। পোস্ট অফিস প্রশাসন বলছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ঠিকাদার লাপাত্তা; ঠিকাদার দেখাচ্ছেন, ফান্ড সংকটের অজুহাত।
এদিকে দাপ্তরিক ভবন হারিয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে পরিচালিত হচ্ছে পোস্ট অফিসের কার্যক্রম। পাকা ভবন না থাকায় ঝুপড়ি ঘরে ভয় ও আতঙ্কে রাত কাটাতে হচ্ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। সরকারি অনেক কাজ করা যাচ্ছে না প্রয়োজনীয় পরিবেশ না থাকায়। এমনকি মানি অর্ডার, মানি ট্রান্সফার কিংবা অর্থসম্পর্কিত লেনদেন থেকে বিরত থাকতে হচ্ছে। এতে সরকারিভাবে পোস্ট অফিস পরিচালিত কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন জনসাধারণ।
জানা যায়, উপজেলা সদর পোস্ট অফিসটি তিন তলাবিশিষ্ট ভবন ছিল। ২০০২ সালে নদী ভাঙনের অজুহাতে তৎকালীন পোস্ট মাস্টার ইচ্ছাকৃতভাবে ভবনটি সরিয়ে নেওয়ার আর্জি জানান। যার প্রেক্ষিতে ভবনটি তড়িঘড়ি করে ভেঙে ফেলা হয়।
অথচ সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটি ভেঙে ফেলার ২৪ বছর পরও মনপুরা পোস্ট অফিস সংলগ্ন পশ্চিম পাশের মেঘনা নদীর দূরত্ব এখনো প্রায় ১ কিলোমিটার। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্তৃক ডাম্পিং ব্লক ফেলে নির্মিত হয়েছে শহর রক্ষা বাঁধ। এতে হয়ে গেছে নদী ভাঙন রোধ।
ইতোপূর্বে ঝুপড়ি টিনসেড ঘরে অনিরাপদভাবে পোস্ট অফিসের কার্যক্রম দেখে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। বিষয়টি উপরস্ত কর্মকর্তাদের নজরে আসলে আমলে নিয়ে মনপুরা উপজেলায় পোস্ট অফিসের নতুন ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়। এতে ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান "মায়া এন্টারপ্রাইজ"কে নিয়োগের মাধ্যমে ২০২৩ সালে নতুন ভবনের কাজ শুরু হয়। কাজ শুরুর তিন বছর পেরিয়ে গেলেও ঠিকাদারের অবহেলার কারণে নতুন ভবনের কাজ বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
এ ব্যাপারে উপজেলা পোস্ট মাস্টার মোঃ আবু তাহের জানান, কি কারণে নতুন ভবনের কাজ বন্ধ রয়েছে তা আমরা কিছুই জানি না। ঠিকাদার তাদের মন মতো কাজ করছেন। এবং আমাদের সাথে তাদের কোন যোগাযোগও নেই। তারা কিছুদিন পরপর এসে পরিদর্শন বইতে স্বাক্ষর করে যান। আমাদের কাছে কাজ সংশ্লিষ্ট কোন তথ্য বা ফাইল নেই। তবে আমরা টিনসেডের এই ঝুপড়ি ঘরে ঝুঁকি নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছি। প্রতিমাসে ২৫০০ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। বহুবার অফিসের বিভিন্ন আসবাবপত্র চুরি হয়েছে। তাছাড়া এখানে তেমন কোন প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র নেই, বসার পর্যাপ্ত চেয়ার টেবিল নেই। তাছাড়া নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে পোস্ট অফিসের নথিপত্র ও গ্রাহকদের টাকা পয়সা। নিরুপায় হয়ে একই ঘরে জীবনের ঝুকি নিয়ে যাত্রি যাপন করতে হচ্ছে আমাদের। স্থান সংকুলান না হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ মালামাল পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। তাই আমাদের অতি দ্রুত পাকা ভবনে যাওয়া জরুরি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টেন্ডারের মাধ্যমে একটি প্যাকেজের আওতায় ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান "মায়া এন্টারপ্রাইজ" কাজ পাওয়ার পর তা বিক্রি করে দেন ভোলার ঠিকাদার মোঃ সুমন ও মনপুরার মোঃ মনির হাওলাদারের কাছে। ২০২১ সালে সুমন ও মনিরের তদারকিতে কাজ শুরু হলেও তাদের বিরুদ্ধে কাজে অনিয়মের বহু অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রথম থেকে পোস্ট অফিসের সীমানার জমিতে থাকা গর্ত ভরাট না করেই কাজ শুরু করেন তারা। ঝুঁকিপূর্ণ জমিতে ভবন নির্মাণ, কাজে নিম্নমানের রড-সিমেন্ট ও বালুর ব্যবহার, প্রয়োজনীয় উপকরন কম দেয়া সহ বহু অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে ঠিকার মনির ও সুমনের বিরুদ্ধে।
এদিকে কাজ বন্ধ ও অনিয়মের ব্যাপারে জানতে ঢাকার মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান 'মায়া এন্টারপ্রাইজ'র কর্তাব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। তবে সাব ঠিকাদার মনির বলছেন, সারাদেশে পোস্ট অফিসের ভবন নির্মাণ প্রকল্পের একটি প্যাকেজের কাজ এটি। আমরা নিয়ম মেনে ভবন নির্মাণে প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যবহার করেছি। কিন্তু প্রচুর অর্থ ব্যয় করে ভবনের ৯০ শতাংশ কাজ শেষ করলেও আমরা কাঙ্খিত বিল পাইনি। এখন ফান্ড সংকটের কারণে কাজ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া কাজটি ২০২৫ সালে বুঝিয়ে দেয়ার কথা থাকলেও আমরা কাজের মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য আবেদন করেছি।
অথচ; কাজ বন্ধ থাকার ব্যাপারে ঠিকাদারের সাথে পোস্ট অফিস প্রশাসনের বক্তব্যের ব্যাপক গরমিল রয়েছে।
এ ব্যাপারে ভোলা দক্ষিণ সার্কেলের পোস্ট অফিস পরিদর্শক আবুল ফয়েজ জানান, ২০২১ সালে শুরু হওয়া কাজটি এতদিনে সম্পন্ন করে বুঝিয়ে দেয়ার কথা। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ঠিকাদার লাপাত্তা থাকায় কাজ বন্ধ রয়েছে। এবং ঠিকাদারের অনুপস্থিতির কারণে ভবনটি একপ্রকার পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। আমরা এ বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। আশা করি দ্রুত ওনারা এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবেন।
