ঢাকা
৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সকাল ১১:২২
logo
প্রকাশিত : এপ্রিল ৩০, ২০২৬

থইথই পানিতে ডুবছে কৃষকের সোনালি স্বপ্ন

গত ২৪ ঘন্টায় টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের চাপে সুনামগঞ্জের জিনারিয়া হাওর রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে পানি ঢুকে বিস্তীর্ণ এলাকার বোরো ধানখেত তলিয়ে গেছে।

মৌলভীবাজারের জুড়ীতে হাকালুকি হাওরে ডুবছে কৃষকের স্বপ্ন, তলিয়ে গেছে পাকা বোরো ধান। নেত্রকোনা জেলার বিভিন্ন হাওরে হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে ধান কাটার কথা বলা হচ্ছে। অনেক স্থানে আধাপাকা ধান কাটছেন কৃষকেরা। কিন্তু অধিকাংশ হাওরেই এখনো প্রায় অর্ধেক বোরো ধান পানিতে তলিয়ে আছে। এতে চরম উদ্বেগ-উত্কণ্ঠায় রয়েছেন হাওরপাড়ের কৃষক।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের চাপে বুধবার সকালে সুনামগঞ্জের বোলাই নদীর পাশের একটি খালের বাঁধ ভেঙে যায়। এতে পানি ঢুকে জিনারিয়া হাওরের ফসলি জমি তলিয়ে যায়। হাওরের অধিকাংশ জমিতেই জিরাতি করতে আসা কৃষকেরা চাষাবাদ করে থাকেন। হঠাত্ এ বিপর্যয়ে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। মুখশেদপুরের কৃষক বক্ত সরকার বলেন, ‘আমরা অনেক কষ্ট করে এই জমিতে ধান ফলিয়েছি। মাসের পর মাস বাড়িঘর ছেড়ে এখানে থাকছি। এখন সব পানির নিচে- আমরা একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম।’ আরেক কৃষক নিকেশ সরকার বলেন, ‘ধারদেনা করে জমি চাষ করেছি। ধান পাকাই ছিল, কিন্তু আবহাওয়া খারাপ থাকায় কাটতে পারিনি। বাঁধ ভেঙে আমার ২০ কাঠা জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব বুঝতে পারছি না।’ উপজেলা কৃষি উপ-সহকারী কর্মকর্তা কবির হোসেন জানান, জিনারিয়া হাওরের ২৬ হেক্টর জমির মধ্যে বাঁধ ভাঙার আগেই জলাবদ্ধতায় ৮ হেক্টর তলিয়ে ছিল। বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর আরও প্রায় ৩ হেক্টর জমি পানির নিচে চলে গেছে।

দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার নাইন্দার হাওর, কাংলার হাওর, দেখার হাওর, কনস্কাই বিলসহ ছোট-বড় অধিকাংশ হাওর টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে। আকস্মিক পানি বৃদ্ধিতে পাকা বোরো ধান ডুবে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে শুধু পানি আর পানি। কোথাও কোথাও ধানের শীষ পানির নিচে ডুবে আছে, আবার কোথাও আংশিক ভেসে আছে। কৃষকরা কোমরসমান পানিতে নেমে শেষ চেষ্টা হিসেবে ধান কাটছেন, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। কৃষক আব্দুল করিম বলেন, ‘এই ধানই ছিল আমাদের সারা বছরের ভরসা। ঋণ করে চাষ করেছি। এখন যা কেটেছি, সেটাও শুকাতে পারছি না। সব দিক থেকেই ক্ষতির মুখে পড়েছি।’

নেত্রকোনা প্রতিনিধি এবং খালিয়াজুরি ও মদন উপজেলা সংবাদদাতা জানান, গত তিনদিনের অবিরাম বর্ষণে নেত্রকোনা জেলার হাওর উপজেলাগুলোর প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ জানিয়েছে , তাদের হিসাব মতে ৩ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল তালিয়ে গেছে। তবে আর যদি কোন বর্ষণ না হয় এবং পানি দ্রুত সরে গেলে বেশ কিছু জমির ধান কৃষকরা ঘরে তুলতে পারবে বলেও কৃষি বিভাগ জানায়। হাওর এলাকায় মাইকিং করে ধান কাটার কথাও বলা হচ্ছে। তবে হাওর এলাকার কৃষকরা অসহায় অবস্থায় রয়েছেন বলে জানিয়েছেন। হাওরের একমাত্র বোরো ফসল বিনষ্ট হলে তাদের বাঁচার আর কোন উপায় থাকবে না বলে জানান। অনেক কৃষক পানিতে তলিয়ে যাওয়া পাকা ধান এবং আধাপাকা ধান কেটে নিচ্ছে।

জেলার ৫টি হাওর উপজেলা মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরি, কলমাকান্দা এবং আটপাড়া উপজেলায় ৪১ হাজার হেক্টর জমিতে এবার বোরোর আবাদ হয়েছে। কৃষি বিভাগের মতে হাওরের প্রায় ৬৮ ভাগ বোরো ধান গতকাল বুধবার পর্যন্ত কৃষকরা ঘরে তুলতে পেরেছে। তবে কৃষকেদের মতে তারা ৫০ ভাগ ফসল এখন পর্যন্ত কাটতে পেরেছে। কারণ বৃষ্টি থামছে না ।খালিয়াজুরি উপজেলা কৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা কৃসক রুহুল আমিন জানান, তার ৫০ কাঠা (স্থানীয় হিসাবে ৫ শত শতাংশ) জমির বোরো জমি তলিয়ে গেছে। খালিয়াজুরির স্থানীয় বাসিন্দা কয়েস আজাদ আশরাফি জানান, খালিয়াজুরি হাওরের চার ভাগের তিন ভাগ বোরো ফসল তলিয়ে গেছে।

কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) সংবাদদাতা জানান, নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার সোনাডুবি, সাইডুবি, পেটকি, মহিশাশুরা, গোরাডোবা ও আঙ্গাজুরাসহ বেশ কয়েকটি হাওরে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। এতে মেদী, তেলেঙ্গাসহ কয়েকটি বিলের পাকা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। আগাম বন্যার শঙ্কায় ঝুঁকি এড়াতে প্রশাসনের তাগিদে কৃষকেরা এখন আধাপাকা ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগামী ২৮ এপ্রিলের মধ্যে দ্রুত ধান কাটার জন্য মাইকিং করা হয়েছে। কিন্তু শ্রমিক ও জ্বালানি সংকটের কারণে হাওরের শতভাগ ধান কাটা সম্ভব হয়নি।

জুড়ী (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা জানান, দেশের বৃহত্তম হাকালুকি হাওরে পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে হাওরজুড়ে বিস্তীর্ণ কৃষিজমির পাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে, যা কৃষকদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। যদিও জেলা প্রশাসন জানিয়েছেন, হাওরে ২৭,৩৫০ হেক্টর বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ২২,৪০৯ হেক্টর বোরো ধান কর্তন সম্পন্ন হয়েছে। যা উত্পাদনের ৮২%। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। স্থানীয় কৃষকরা আক্ষেপ করে বলেন, মৌসুমের শেষ প্রান্তে এসে এমন আকস্মিক বৃষ্টিপাত তাদের সব পরিশ্রমকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলার সবকটি নদনদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে জেলার ৩৯টি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকার পাকা বোরো ধান ও গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি পানিতে তলিয়ে গেছে। গত ২৪ ঘন্টায় জেলায় ১২৫ মি মি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। খোয়াই নদীর চুনারুঘাট বাল্লা, শায়েস্তাগঞ্জ ও সদর উপজেলার মাছুলিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। এদিকে কুশিয়ারা, কালনী কুশিয়ারা, সুতাং ও সোনাই নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, অব্যাহত বৃষ্টি ও উজান থেকে আশা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে পাঁচ শতাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে জেলার প্রধান চারটি নদ নদীর পানি ধীরে ধীরে বাড়ছে। জুড়ী নদে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া কুশিয়ারা, মনু ও ধলাই নদে পানি বেড়েছে। অব্যাহত বৃষ্টি থাকলে বন্যা হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram