

পিন্টু দেবনাথ, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি: বসন্তের আগমনে প্রকৃতির রূপ বদলে গেছে মৌলভীবাজারে। জেলার সদর উপজেলাসহ শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া ও কমলগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে এখন চোখে পড়ছে শুভ্র সাদা বুনো ফুল ‘ভাটি’। রাস্তার ধার, পরিত্যক্ত ভিটেবাড়ি আর চা-বাগানের পাশের ঝোপঝাড়ে এই বুনো ফুলের সমারোহ পথচারীদের নজর কাড়ছে।
সাধারণত অবহেলিত এই বুনো ফুলটি কোনো যত্ন ছাড়াই বেড়ে ওঠে। তবে মৌলভীবাজারের চা-বাগান সংলগ্ন এলাকাগুলোতে এর বিস্তার সবচেয়ে বেশি।
ছোট ছোট পাঁচটি পাপড়িবিশিষ্ট এই ফুলের মাঝখানে রয়েছে রক্তিম আভা এবং দীর্ঘ পরাগদণ্ড।
বিকেলের পর থেকে এই ফুলের মৃদু ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশ। দূর থেকে মনে হয় যেন ঝোপের ওপর সাদার আস্তরণ পড়ে আছে। গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠো পথ ও আনাচে-কানাচে অযত্নে অবহেলা প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা ফোটা শুভ্র সাদা ভাঁটফুলের অপরুপ দৃশ্য চোখ জুড়াচ্ছে প্রকৃতি প্রেমিদের। জেলা জুড়ে বিভিন্ন সড়কের দু'পাশে অযত্নে, অনাদরে ও অবহেলায় বেড়ে ওঠা গ্রামবাংলার অতি পরিচিত বহুবর্ষজীবী বুনো উদ্ভিদ হচ্ছে ভাঁট গাছ। গ্রাম বাংলার চিরচেনা এ ফুলটি হরহামেশা দেখা গেলেও সাদা ফুলের দিকে তাকালে অনেকের মন ভালো হয়ে যায়। মনের মধ্যে একটা ভাল লাগার অনুভূতি জাগে।
অঞ্চলভেদে এই গাছের ফুল ভাইটা ফুল, ঘেটু ফুল, ভাত ফুল, বনজুঁই ফুল, ঘণ্টাকর্ণ হলেও ফুলবাড়ীতে ভাঁট ফুল নামেই পরিচিত। যাওয়ার পথে দুই পাশে ভাঁট ফুলের সমারোহ দেখলে মনে হবে প্রকৃতি যেন অপরূপ সাজে সেজেছে। এছাড়া গ্রাম বিভিন্ন চরাঞ্চলসহ সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা চার পাশের বাঁশ ও সুপারী বাগানগুলোতে ভাঁট ফুলের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হবেন যে কেউ।
চলাচলকারী ফুল প্রেমিরা দেখে মুগ্ধ হন। বসন্তের আগমনে পলাশ-শিমুলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই ফুল ফোঁটে। এই ফুল ফাল্গুন ও চৈত্র মাসে দেখা যায়। বিশেষ করে পরিত্যক্ত মাঠ, বন, রাস্তা কিংবা জলাশয়ের পাশে ভাঁট ফুলের ঝোঁপ চোখে পড়ে। এর বৈজ্ঞানিক নাম, ক্লেরোডেনড্রাম ভিসকোসাম। ইংরেজি নাম হিল গেন্টারি বোয়ার ফ্লাওয়ার।
জানা গেছে, এই ভাঁটফুলের আদি নিবাস ভারতবর্ষ, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার অঞ্চলে। তবে যতদিন যাচ্ছে ততই হারিয়ে যাচ্ছে ভাঁটফুল। আগে সব খানেই এ প্রজাতির ফুলের বিস্তার ছিল। এখন বেশ দুর্লভ। গ্রামে কমেছে, শহরে তেমন চোখে পড়ে না। কিন্তু ফুলপ্রেমীরা খুঁজলে নিরাশ হবেন না।
স্থানীয় গ্রামবাসী জানান, একসময় এই ফুল প্রচুর দেখা গেলেও আবাদি জমি বৃদ্ধি ও বনজঙ্গল পরিষ্কার করার কারণে এর সংখ্যা কমে আসছিল। তবে এ বছর মৌলভীবাজারের বিভিন্ন নির্জন স্থানে ফুলের ব্যাপক উপস্থিতি প্রকৃতিপ্রেমীদের আনন্দ দিচ্ছে। বিকেলে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা এবং পর্যটকরা এই শুভ্রতার মাঝে ছবি তুলে সময় কাটাচ্ছেন।
উদ্ভিদবিদদের মতে, ভাটি ফুল বা ঘেঁটু শুধু সৌন্দর্যের আধার নয়, এর ভেষজ গুণও রয়েছে। গ্রামীণ চিকিৎসায় এর পাতা ও শিকড় বিভিন্ন চর্মরোগ নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া এই ফুল জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এবং মৌমাছিদের মধু সংগ্রহের অন্যতম উৎস হিসেবে কাজ করে।
বসন্তের এই সময়টাতে যান্ত্রিক জীবন থেকে একটু স্বস্তি পেতে মৌলভীবাজারের যেকোনো গ্রামীণ পথ আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে এই বুনো সৌন্দর্যে অবগাহন করতে।

