

আবদলু জলিল, কাজিপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি: ফলটির নাম আনারকলি। তবে কোথাও এটিকে ট্যাংক ফল বা টক ফল নামেও ডাকা হয়। বিদেশে এই ফলটির নাম প্যাশন ফ্রুট। তবে নাম যা-ই হোক, এই ফলটির আদি নিবাস পাড়াড়ি অঞ্চল। কিন্তু সমতলে এই ফল চাষ করে সফলতার মুখ দেখেছেন সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার সোনামুখী ইউনিয়নের স্থলবাড়ি গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা বেলাল হোসেন (৫৫)। এবছর ছয় শতক জমিতে আনারকলি ফলের ১৪টি গাছ রোপণ করেছেন তিনি। আর প্রথম বছরেই করেছেন বাজিমাত। প্রতিদিন বাগান থেকে ফল তুলে স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি শুরু করেছেন তিনি।
সরেজমিন গত রবিবার দুপুরে বেলাল হোসেনের আনারকলি বাগানে গিয়ে কথা হয় তার সাথে। তিনি জানান, গত বছর তার ছেলের বউ নাটোর বাপের বাড়ি থেকে আনারকলি ফলের চাষ দেখে তাকে জানান। পরে তিনি সেখান থেকে প্রতিটি ৫০ টাকা করে মোট ১৪টি চারাগাছ কিনে আনেন। এরপর প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ করে সেই চারাগাছগুলো রোপণ করেন। গতমাস থেকে সেই গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করা শুরু করেন তিনি। ঝুমকো লতার মতো এই গাছ অনেক লম্বা হয়। একবার লাগালে কমপক্ষে তিন থেকে চার বছর তাতে ফল পাওয়া যায়। এই গাছের জন্যে মাচা বানিয়ে দেয়া হয়েছে। মাচার উপরে থাকে লতানো গাছ আর নিচে ঝুলের থাকে অসংখ্য ফল।
বেলাল হোসেন জানান, জমি প্রস্তুত, সার ও বালাইনাশক প্রয়োগ, মাচা তৈরিতে তার মাত্র সাড়ে চার হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আর প্রতিটি ফল ১০ থেকে শুরু করে ২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন তিনি। গত এক মাসে তিনি প্রায় পঁচিশ হাজার টাকার ফল বিক্রি করেছেন। প্রথমে এই ফল তেমন কেউ চিনতো না। যারা চিনতো তারা কিনতো। কাটলে এই ফলের ভিতরে হলুদাভ রসপূর্ণ অনেকগুলো বিচির মতো থলে দেখা যায়। কদবেলের মতো ফুটো করে মসলা দিয়ে ঘুটে নিয়ে এই ফল খেতে হয়। হালকা মিস্টি ও টক এই ফলটি খেতে অনেক সুস্বাদু ও মুখরোচক।
প্রতিদিন আনারকলির বাগান দেখতে অনেক লোকজন আসেন বলে জানান বেলাল হোসেন। অনেকে মোবাইল ফোনে ফলসহ বাগানের ভিডিও করে নিয়ে যায়। বেলালের নিকট থেকে আগতরা এই ফল সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেয়। বাগানেই খাবার উপযোগী করে বেলাল তাদের এই ফল পরিবেশন করেন। এমনি করে এই অঞ্চলে আনারকলির পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ছে বলে জানান তিনি।
কাজিপুরের সোনামুখী, ঢেকুরিয়া, বগুড়া জেলার ধুনট বাজারে প্রতিদিন দুপর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বেলা হোসেন এই ফল বিক্রি করেন। যারা এই ফল না চেনের তারা নেড়েচেড়ে দেখেন। ফল সম্পর্কে জেনে নেবার পরে কিনে নেন। বেলাল জানান, প্রতিদিন গড়ে পাঁচশ থেকে সাতশ টাকার ফল বিক্রি হয়।
বেলালের বাগানে ফল কিনতে আসা কয়েকজন জানান, আমরা এই ফল সম্পর্কে শুনে আজকে কিনে খেলাম। কদবেলের চেয়েও এই ফলের স্বাদ বেশি।
বেলালের প্রতিবেশী ও ইউপি সদস্য কেএম আনোয়ার হোসেন জানান, “বেলাল মূলত স্মার্ট একজন কৃষি উদ্যোক্তা। এ পর্যন্ত তিনি উন্নত জাতের সীম, কলা, লাউসহ নতুন নতুন জাতের চাষ করেন। এবছর তিনি পাহাড়ি আনারকলি ফলের চাষ করে আমাদের তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।”
বেলাল এই প্রতিবেদককে জানান, “আমি মূলত শখের বশে নতুন নতুন ফসলের ও ফলমূলের আবাদ করে থাকি। পাহাড়ি আনারকলি ফল সম্পর্কে জানতে পেরে অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই এর আবাদ করি। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত পরামর্শ পাই। ফল বিক্রি করে অনেক ভালো লাগছে। এক মাসেই পঁচিশ হাজার টাকার ফল বিক্রি করেছি। এ মৌসুমে যে ফল গাছে আছে তাতে করে আরও কুড়ি হাজার টাকার মতো বিক্রির আশা করছি। ”
কাজিপুর উপজেলা কৃষি অফিসার শরিফুল ইসলাম জানান, “বেলাল একজন আদর্শ কৃষি উদ্যোক্তা। এ বছর তিনি আনারকলি ফলের চাষ করেছেন। এটার আবাদে খরচ কম লাভ বেশি। আমরা তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করে আসছি।” বেলালের দেখাদেখি আনারকলির চাষাবাদ আরও এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

