

দেশের সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, জলাশয় দখল ও দূষণ রোধ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অধিকার নিশ্চিতে জলমহাল আইনের খসড়া প্রস্তুত করেছে সরকার।
খসড়া আইনে জলমহাল অবৈধভাবে দখল, ভরাট, দূষণ, প্রাকৃতিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি এবং জলজ সম্পদ বিনষ্টের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কারাদ- ও অর্থদ-সহ কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু বলেন, 'দেশের নদী, খাল, বিল, হাওর, বাঁওড় ও অন্যান্য সরকারি জলমহাল শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এগুলো আমাদের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং লাখো মানুষের জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে জলমহাল দখল, ভরাট, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার কারণে এসব সম্পদ হুমকির মুখে পড়েছে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার একটি যুগোপযোগী ও কার্যকর সরকারি জলমহাল আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে।'
তিনি বলেন, নতুন আইনের মাধ্যমে জলমহালের সুরক্ষা, টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অধিকার নিশ্চিত করা হবে।
একই সঙ্গে অবৈধ দখল, ভরাট, পরিবেশ বিনষ্ট এবং জলজ সম্পদ ধ্বংসের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, যাতে কেউ সরকারি জলমহাল ক্ষতিগ্রস্ত করার সাহস না পায়।
মন্ত্রী আরও বলেন, 'এই আইন শুধু শাস্তিমূলক আইন নয়; এটি জলমহাল সংরক্ষণ, পরিবেশ রক্ষা, মৎস্যসম্পদের উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষার একটি সমন্বিত আইন। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নিয়ে আইনটি চূড়ান্ত করা হবে, যাতে এটি বাস্তবমুখী ও কার্যকর হয়।'
ভূমি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন বিধিমালা, প্রশাসনিক আদেশ ও নীতিমালার মাধ্যমে পরিচালিত হলেও একটি পূর্ণাঙ্গ আইন না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে জটিলতা তৈরি হয়।
নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে জলমহাল সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহারকে একটি সমন্বিত আইনি কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খসড়া আইনের বিধান অনুযায়ী, দেশের সব সরকারি জলমহালের একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গুরুতর অপরাধগুলোকে আমলযোগ্য ও অজামিনযোগ্য করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে, যাতে অবৈধ দখলদার ও পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
পরিবেশবিদদের মতে, দেশের জলমহালগুলো শুধু মাছ উৎপাদনের উৎস নয়, বরং বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি ধারণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এসব জলাশয় রক্ষায় একটি শক্তিশালী আইন সময়ের দাবি ছিল।
মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকা সরাসরি জলমহালের ওপর নির্ভরশীল। জলমহাল সংরক্ষণ এবং প্রকৃত জেলেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে মৎস্য উৎপাদন বাড়বে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তবে পরিবেশবিষয়ক সংগঠনগুলো বলছে, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, এর কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। জলমহাল ইজারা প্রদান, ব্যবস্থাপনা ও তদারকিতে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে আইনের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, খসড়া আইনের ওপর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ, মৎস্যজীবী সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। এসব মতামত পর্যালোচনা শেষে আইনটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে।
