ঢাকা
২১শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সকাল ১০:১৯
logo
প্রকাশিত : জুন ২১, ২০২৬

অতীতে এত শিশুর মৃত্যু দেখেনি বাংলাদেশ

বাংলাদেশে হামে এত বিপুলসংখ্যক শিশুর সংক্রমণ এবং মৃত্যু এর আগে কখনো হয়নি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাব ও এর উপসর্গে দেশে আশঙ্কাজনক হারে শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১৫ মার্চ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গে মোট ৬৭৭ জন শিশুর মৃত্যু হয় হাম ও উপসর্গে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৯৩ শিশু এবং হামের উপসর্গে মারা গেছে ৫৮৪ জন। হাম ও উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখের উপরে শিশু।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভয়াবহ পরিস্থিতির নেপথ্যে রয়েছে বেশ কিছু কারণ—অন্তর্বর্তীকালীন সরকার টিকা না দেওয়ার কারণে শিশুদের ‘হার্ড ইমিউনিটি’ নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া মাঠ পর্যায়ে টিকা না থাকা, ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন সময়মতো না হওয়া এবং কাভারেজ কমে যাওয়া ইত্যাদি কারণে শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। যারা টিকার বাইরে ছিল, তাদের সন্তানেরা হামে আক্রান্ত বেশি হচ্ছে। আগে টিকা নেওয়ার পর কি পরিমাণ এন্টিবডি তৈরি হয়েছিল তার হালনাগাদ কোণ গবেষণা নেই। ফলে কারো কারো শরীরে টিকার প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে কি-না, সেটাও যাচাই করা হয় না। ফলে যাদের হার্ড ইমিউনিটি নষ্ট হয়ে যায়, আবার যারা টিকা না নিয়েও সুরক্ষিত ছিল, তারাই হামের সহজ শিকার এবং সেসব নারীদের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া শিশুরাও হামের শিকার হয়। এছাড়া অপুষ্টির কারণে যে সব শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম ছিল তারাও আক্রান্ত হয়। এসব কারণে হামের সংক্রমণ হচ্ছে এবং মৃত্যুও ঘটছে।

আক্রান্ত শিশুকে দেরিতে হাসপাতালে নেওয়ার কারণেও অনেকের মৃত্যু হয়। উপসর্গের তীব্রতা বোঝার আগেই অনেকে বাসায় চিকিৎসা করেন, যার ফলে শারীরিক জটিলতা (নিউমোনিয়া ইত্যাদি) বেড়ে মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হয়। চিকিৎসা ঘাটতিও শিশু মৃত্যুর অন্যতম কারণ—প্রত্যন্ত অঞ্চলে হামের উন্নত ও সময়মতো চিকিৎসার অভাব রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামে এতো শিশুর মৃত্যুর পেছনে নীতি-নির্ধারকদের কিছু ভুল সিদ্ধান্তও দায়ী। আর টিকার ঘাটতি আরও উসকে দিয়েছে হামের প্রাদুর্ভাবকে। এর আগে ২০১৭ সালে মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়, যা ছিল বিগত এক দশকে হামে সর্বোচ্চ প্রাণহানির রেকর্ড।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরি বলেন, হামে যে মানুষ মারা যেতে পারে, এই কথাটাই গত ৩০-৩৫ বছরে মানুষ ভুলে গিয়েছিল। যখন দেশে হার্ড ইমিউনিটি ছিল, তখন মায়েরা টিকা না নিয়েও সুরক্ষিত ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার টিকা না দেওয়ার কারণে হার্ড ইমিউনিটি একদম নষ্ট হয়ে গেল। অর্থাৎ ৯৫ শতাংশের জায়গায় যখন ৫৯ শতাংশে নেমে আসল। ফলে এমন মেয়েরা যখন গর্ভবতী হয়ে গেল, মায়ের পেট থেকে যে শিশুরা হামের এন্টিবডি নিয়ে জন্মায়—সেটা কিন্তু আর হলো না। ফলে ঐ শিশুরা হাম আক্রান্তের সহজ শিকার হয়ে গেল।

‘মায়েরা বাচ্চাদের বুকের দুধ কম খাওয়াচ্ছে’—এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আশি বা নব্বই দশকে যত মায়েরা বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াতো—এখন তার চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক মা বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে। ফলে এটাও কারণ না।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান—আইইডিসিআর এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, ‘দেশে হামের টিকা চালু হওয়ার পরে, এতো শিশুর মৃত্যু হিস্ট্রিতে নাই। টিকার ঘাটতিই হামে এতো মৃত্যুর কারণ। আরেকটি কারণ আমাদের দেশে প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ব্যবস্থা ভালো না। তিনি বলেন, কোভিডের পর থেকে অনেক মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে চলে গেছে। দারিদ্র্যের হার বেড়েছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পুষ্টিহীনতা এবং মৃত্যু।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, হামের এই পরিস্থিতিতে উচিত ছিল মহামারি ঘোষণা করা। মহামারি ঘোষণা হলে দেশে একটা জরুরি স্বাস্থ্যব্যবস্থা থাকতো। এ ব্যবস্থায় একটা প্ল্যান থাকে, একটা বাজেট থাকে, অর্থ বরাদ্দ থাকে, তার সঙ্গে নানা ধরনের ব্যবস্থা থাকে। এছাড়া এতো রোগীর চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে একটা গাইডলাইন থাকা উচিত। কারণ সবাই তো একরকম চিকিৎসা দিতে পারবে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক এই পরিচালক বলেন, যে মৃত্যুগুলো হচ্ছে—তার কি আমরা অডিট করছি? অডিটে দুর্বলতাগুলো ধরতে পারলে, তা দূর করতে পারলে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা ভালো হতো, আমরা মৃত্যুগুলো প্রতিরোধ করতে পারতাম। সুতরাং এতো মৃত্যু আসলে প্রত্যাশিত ছিল না এবং আমাদের যতটুকু মনোযোগ দেওয়া দরকার, যতটা অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত ছিল, যে পরিমাণ অর্থ, যন্ত্রপাতি দিয়ে এটাকে মোকাবিলা করা দরকার ছিল—সেটা আমরা করিনি। তাই এই দুঃখজনক মৃত্যুগুলো ঘটছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন ১০ হাজার ৯৪৯ জন। পাশাপাশি সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা ৯১ হাজার ৭৮৯ জন। এছাড়া হাম সন্দেহে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ৭৫ হাজার ৯০২ জন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছে ৭১ হাজার ৯৭০ জন। গতকাল শনিবার বিকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো হাম বিষয়ক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram