

নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি, ইউটিলিটি খরচের ক্রমাগত চাপে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এখন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। একসময় যেসব পরিবার মাসে বা সপ্তাহে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা বাজার-খরচের জন্য আলাদা করে রাখত, তাদের সেই হিসাব এখন মেলানো কঠিন। জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের প্রভাবে গণপরিবহন ও যাতায়াত খরচ বেড়েছে। অফিসের যাতায়াত কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া এখন অতিরিক্ত খরচের খাত। বাড়তি খরচের হিসাব মিলাতে গিয়ে মানুষ তাদের বিনোদন, ভ্রমণ এবং ভবিষ্যত্ সঞ্চয়ের মতো খাতগুলোতে খরচ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি কোনো একক ব্যক্তির সমস্যা নয়, এটি সমগ্র অর্থনীতির ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মানুষের কেনার ক্ষমতা কমে গেলে সামগ্রিক বাজারে চাহিদাও কমে যায়, যা ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে শ্লথ করে দেয়। সরকারি হিসাবেও উঠে এসেছে দেশের সঞ্চয় প্রবণতা কমে যাওয়ার।
জাতীয় সঞ্চয় ধারাবাহিকভাবে কমছে :টাকার অঙ্কে দেশের অর্থনীতির আকার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চলতি মূল্যে দেশজ ও জাতীয় উভয় ধরনের সঞ্চয়ের পরিমাণও বেড়েছে। তবে মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) অনুপাতে দেশজ ও জাতীয় সঞ্চয়ের হার সেভাবে বাড়েনি, উলটো ধারাবাহিকভাবে কমেছে। তিন অর্থবছর ধরেই জিডিপির অনুপাতে জাতীয় সঞ্চয় ধারাবাহিকভাবে কমছে। অর্থাত্ অর্থনীতির আকার বাড়লেও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সঞ্চয়ের হার বাড়েনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রকাশিত ‘জাতীয় হিসাব পরিসংখ্যান’ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় সঞ্চয়ের পাশাপাশি জিডিপিতে বিনিয়োগের হারও ধারাবাহিকভাবে কমেছে। তার বিপরীতে বেড়েছে ভোগ ব্যয়।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে জাতীয় সঞ্চয়ের হার ছিল ২৯.৯৫ শতাংশ। আর সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে সেই হার কমে নেমে এসেছে ২৬.৯৩ শতাংশে। অর্থাত্ তিন অর্থবছরের ব্যবধানে জাতীয় সঞ্চয় প্রায় ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচের চাপ বেড়েছে। ফলে আয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে ভোক্তাদের সঞ্চয়ের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
জিডিপির তুলনায় সঞ্চয়ের হার কমে যাওয়ার মানে হলো বিনিয়োগের জন্য মূলধনও কমে যাওয়া। আর বিনিয়োগ কম হলে তার প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থান ও মানুষের আয়ে। আবার জাতীয় সঞ্চয় কমে গেলে তাতে বৈদেশিক বা অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যেতে পারে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সীমানার ভেতর পণ্য ও সেবা খাত থেকে যে পরিমাণ আয় হয়, সেখান থেকে দেশের ভেতরের জনগণ ও সরকারের মোট ভোগ ব্যয়ের অংশ বাদ দিলে যা অবশিষ্ট থাকে, তা-ই দেশজ সঞ্চয়। আর দেশজ সঞ্চয়ের সঙ্গে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ (রেমিট্যান্স) এবং বিদেশি কোনো খাতের আয় মিলিয়ে হয় জাতীয় সঞ্চয়। বিবিএসের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন অর্থবছরে জিডিপিতে মোট ভোগ ব্যয়ের হার ৭৪.২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৮.৬২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ভোগ ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে কয়েক বছর ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি।
নেতিবাচক প্রভাব বিনিয়োগে :বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ছয় বছর আগে জিডিপিতে মোট বিনিয়োগের হার ছিল ৩১ শতাংশের ওপরে। বর্তমানে তা কমে ২৮ শতাংশের নিচে নেমেছে। এ সময় বেসরকারি ও সরকারি বিনিয়োগ উভয়ই কমেছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে :পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে সেপ্টেম্বরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়ে ৮.৩৪ শতাংশ হয়েছে। আগস্টে এই হার ছিল ৮.২৬ শতাংশ। গত মাসের দ্বিতীয়ার্ধে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে পড়ছে, এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেল। টানা তিন মাস ৯ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি থাকার পর জুলাই ও আগস্টে মূল্যস্ফীতি কমেছিল। সেপ্টেম্বরে আবার মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়ল। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এর ফলে সীমিত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো খরচের চাপে আছে। ২১ সেপ্টেম্বর অকটেন, পেট্রল ও ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয়। এতে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে। ফলে বাজারে শাকসবজি, মাছ ও মাংসের দাম চড়া। মূল্যস্ফীতি বাড়লেও জাতীয় গড় মজুরি হার কমেছে। সেপ্টেম্বরে জাতীয় গড় মজুরি হার হয়েছে ৭.৯০ শতাংশ, যা আগস্টে ছিল ৮.০৫ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে যত মূল্যস্ফীতি হয়েছে, এর চেয়ে মজুরি কম বেড়েছে। ফলে বাজার থেকে পণ্য কিনতে ভোগান্তি বাড়ছে।
মূল্যস্ফীতি বাড়বে, আরও চাপে পড়বে মানুষ :আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস বলছে, চলতি অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩.২ শতাংশে। বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি হতে পারে ১০.৯ শতাংশ। আগামী কয়েক বছরেও অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর জোরালো আভাস নেই। বরং আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ২.২ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে মনে করছে আইএমএফ। মঙ্গলবার ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট আউটলুক প্রকাশ করেছে আইএমএফ। প্রবৃদ্ধির এই নিম্নগতি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ বাড়াবে। আর উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে দেবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। এরই মধ্যে গত ৪ বছরে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে বলে সম্প্রতি জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে আছে দেশের প্রায় সোয়া ৬ কোটি মানুষ। অর্থাত্ অর্থনীতির দুর্বলতার চাপ শুধু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকছে না, তা সরাসরি পড়ছে মানুষের জীবনযাত্রায়। দুর্বল ব্যাংক খাত, জ্বালানিসংকট, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা ও রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সব মিলিয়ে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানুষের জীবনযাত্রার মান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
