

দেশের অর্থনীতিতে ভয়ঙ্কর রূপে মন্দাভাব চলছে। একদিকে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে অস্থিরতার চাপ, অন্যদিকে বিনিয়োগে স্থবিরতায় বিরূপ প্রভাব পড়েছে। তার মধ্যেও চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর আদায় ১৭ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে এনবিআর।
অন্যদিকে, রিটার্ন জমার পরিমাণও বেড়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৭৭ শতাংশ। রিটার্ন জমার হার বৃদ্ধির কারণে আয়কর খাতে রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। তার মধ্যে আয়কর ও ভ্যাট থেকে ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি এবং কাস্টম খাত থেকে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
এনবিআর সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে আয়কর আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অর্থাৎ জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এনবিআরের আয়কর অনুবিভাগ আদায় করেছে ৩৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৭ শতাংশ বেশি। প্রবৃদ্ধির মূলে রয়েছে— আইনগত নীতিমালার পরিবর্তন।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে একই সময় এ খাত থেকে আদায় হয়েছিল প্রায় ২৮ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে আয়কর আদায় বেড়েছে প্রায় ৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের কোনো তথ্যই এখন পর্যন্ত প্রকাশ করেনি এনবিআর।
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আয়কর আইনি কাঠামোর পরিবর্তন, উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের কাছ থেকে বেশি কর আদায় এবং মূলধনি আয় থেকে রাজস্ব বাড়ার কারণে আয়কর আদায়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ ছাড়া করদাতাদের রিটার্ন জমায় উৎসাহিত করতে আগাম রিটার্ন দাখিলে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, চলতি করবর্ষের প্রথম তিন মাসে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের রিটার্ন জমা পড়েছে ১২ লাখ ৫৩ হাজার। আগের বছরের একই সময় জমা পড়েছিল ৭ লাখ ৯ হাজারটি। অর্থাৎ রিটার্ন জমার সংখ্যা বেড়েছে ৭৭ শতাংশ। রিটার্ন জমার হার বৃদ্ধির কারণে আয়কর খাতে রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ চার হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এটি প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। অথচ আগের অর্থবছরে সব মিলিয়ে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে গত অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে ৪৫.৫৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে আয়কর ও ভ্যাট থেকে ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা করে এবং কাস্টম খাত থেকে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
ভ্যাটে রিটার্ন পদ্ধতির পরিবর্তন ও আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব : রাজস্ব আদায়ের অন্যতম উৎস মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট। চলতি অর্থবছরের শুরুতে ভ্যাট রিটার্ন জমার নিয়মে পরিবর্তন আনা হয়। ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মাসিক ভ্যাট রিটার্নের পরিবর্তে তিন মাস অন্তর রিটার্ন দাখিল ও ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় রিটার্ন দাখিল ও ভ্যাট আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৯ হাজার ৩০২ কোটি টাকা। আগের বছরের একই মাসে আদায় হয়েছিল ১১ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে আদায় কমেছে প্রায় ১৯.৪ শতাংশ। আগস্টে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের ১১ হাজার ৮১ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ২৪.৫ শতাংশ কম। দুই মাসে মোট ভ্যাট আদায় দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় ২২ শতাংশ কম।
ভ্যাট আদায়ের এই পরিস্থিতিতে গত ২৮ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভা মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন সংশোধনের অনুমোদন দেয়। সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, প্রতি তিন করমেয়াদ শেষে রিটার্ন দাখিলের পরিবর্তে প্রতিটি করমেয়াদ শেষে পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। অর্থাৎ সাধারণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে আবারও মাসিক ভিত্তিতে ভ্যাট রিটার্ন জমা দিতে হবে। সরকারি ছুটি থাকলে পরবর্তী কর্মদিবসে রিটার্ন দাখিলের সুযোগ থাকবে। সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বিমা এবং শূন্য রিটার্ন দাখিলকারীদের জন্য ২০ দিনের সময়সীমা রাখা হয়েছে।
এদিকে এনবিআর জুলাই ও আগস্ট মাসের বকেয়া রিটার্ন জমার সময়ও ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এ সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে জরিমানা আরোপ করা হবে না বলে জানানো হয়েছে।
কাস্টমেও বাড়তি চাপ : আমদানি-রপ্তানি পর্যায়ে শুল্ক ও কর আদায় এনবিআরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। গত অর্থবছরে কাস্টম খাতে আদায় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা। নতুন অর্থবছরে আমদানি-রপ্তানির প্রবণতা, শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি এবং শুল্ক অব্যাহতির প্রভাব এ খাতের আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে কাস্টম খাতে রাজস্ব আদায়ের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সুত্র: রূপালী বাংলাদেশ
