ঢাকা
logo
প্রকাশিত : September 19, 2026

নারী শ্রমিকদের বিদেশে যাওয়া ১৪% বেড়েছে

রেমিট্যান্সের আশায় প্রতিবছর হাজারো নারী শ্রমিক বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। এর মধ্যে বড় একটি অংশ যাচ্ছে গৃহকর্মী হিসেবে।

কিন্তু বিদেশ যাওয়ার আগে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান, চাকরির চুক্তিপত্র ও নিয়োগকর্তার বিষয়ে যথাযথ তথ্য না থাকায় গন্তব্য দেশে গিয়ে বিপদে পড়ছেন অনেকে। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, মজুরি বঞ্চনা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, পাসপোর্ট আটকে রাখা ও গৃহবন্দি করে রাখার মতো অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ ফিরছেন কফিনবন্দি হয়ে। ফলে বিদেশে নারী শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যা বাড়লেও তাঁদের নিরাপত্তা ও অধিকার কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি জাতীয় সংসদেও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিন লাখের বেশি নারী কর্মীর বিদেশ যাওয়ার তথ্য উল্লেখ করে তাঁদের নিরাপত্তাহীনতা, মজুরি বঞ্চনা ও চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ধরেন। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি সংসদে অভিযোগ করেন, গত আট বছরে প্রায় ৮০০ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। অর্থাৎ প্রতিবছর এক শ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরছে।

এ অবস্থায় প্রবাসী নারী কর্মীদের সুরক্ষায় ২৪ ঘণ্টার হটলাইন, সেফ হোম, বীমা সুবিধা এবং বিদেশি নিয়োগকর্তার সত্যতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করার দাবি জানান তিনি।

জবাবে প্রবাসীকে ল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানপ্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, বিদেশে কর্মরত নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ১৬১৩৫ নম্বরে টোল-ফ্রি হটলাইন চালু রয়েছে। দেশের বাইরে থেকেও কর্মীরা সেখানে অভিযোগ জানাতে পারেন। অভিযোগ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং দূতাবাসগুলো সহায়তা করে।

এরই মধ্যে ১০টি দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আইনি সহায়তা কার্যক্রম চালু হয়েছে। সৌদি আরবে দুটি সেফ হোম রয়েছে। ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরো কয়েকটি দেশে পর্যায়ক্রমে সেফ হোম পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শ্রমবিষয়ক চুক্তি ও সমঝোতা বাড়ানোর ফলে নির্যাতনের শিকার কর্মীদের আইনি প্রতিকার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে নারী কর্মীদের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৬২ হাজার ৩১৭ জন নারী কর্মী বিদেশে গেছেন। আর ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় পাঁচ হাজার ২১৪ জন বা প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি নারী কর্মী বিদেশে গেছেন। এ সময় ৪৮টি দেশে ৪২ হাজারের বেশি নারী গেছেন, যার ৯০ শতাংশের বেশি সৌদি আরব ও জর্দানে। এ ছাড়া কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জাপান, ইতালি, সিঙ্গাপুর, সাইপ্রাস, মরিশাস, দক্ষিণ কোরিয়া,

গ্রিস, পর্তুগাল, লাওস, মাল্টা, ইরাক, লেবানন, রুমানিয়া, কেনিয়া, যুক্তরাজ্য, ভিয়েতনাম, রাশিয়া, সার্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশে নারী শ্রমিক যাওয়ার তথ্য রয়েছে। এমনকি টোঙ্গা, বাহামাস, নিউজিল্যান্ড, ফিজি ও মঙ্গোলিয়ার মতো অপ্রচলিত গন্তব্যেও বাংলাদেশি নারী শ্রমিক যাওয়ার তথ্য রয়েছে। গত বছরের একই সময়ে ৫০টি দেশে ২৩ হাজার ৯৩৬ নারী শ্রমিক গিয়েছিলেন। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে নতুন শ্রমবাজারে নারী শ্রমিক যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০০৪ সাল থেকে বাংলাদেশি নারী শ্রমিকের বিদেশযাত্রা শুরু হয়। ২০১৩ সালে এ সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়ায়। ২০১৫ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে নারী গৃহকর্মী পাঠানোর চুক্তির পর বিদেশে নারী শ্রমিক যাওয়ার সংখ্যা দ্রুত বাড়ে। বর্তমানে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশই নারী শ্রমিকদের প্রধান গন্তব্য। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অপ্রচলিত শ্রমবাজারেও নারী শ্রমিক পাঠানো হচ্ছে। বর্তমানে ১০ লাখের বেশি নারী কর্মী বিদেশে কাজ করলেও নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হয়ে দেশে ফেরা নারীর পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান নেই বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন, যাঁদের বড় অংশেরই শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ২০২১ সাল থেকে পাঁচ বছরে ৪১২ নারী অভিবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৮৪ জনের মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশে ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের কর্মপরিবেশের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) এক গবেষণায়।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ৯৪ শতাংশ নারী নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৪৭ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির কথা জানিয়েছেন। চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন ৯৭ শতাংশ। ৮০ শতাংশ নারী পর্যাপ্ত খাবার পাননি। ৮২ শতাংশ নারীকে ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে। ১৫ শতাংশ নারীকে খাবার বা পানি ছাড়াই ঘরে আটকে রাখা হয়েছে। ৯৭ শতাংশ নারীকে সাপ্তাহিক ছুটি দেওয়া হয়নি। আর সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো চাকরির চুক্তি। বেশির ভাগ নারী শ্রমিক বাংলাদেশ ছাড়ার আগে চাকরির চুক্তিপত্র পান না। ফলে বিদেশে গিয়ে কাজের ধরন, কর্মঘণ্টা, বেতন, ছুটি কিংবা নিয়োগকর্তার দায়বদ্ধতা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে কার্যকর প্রমাণ থাকে না বলে জানা গেছে।

প্রবাসী নারী শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি। সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সীমা জহুর বলেন, শ্রমিকরা রেমিট্যান্স পাঠান বলে রাষ্ট্র উপকৃত হয়। অথচ তাঁদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়েই বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। দরিদ্র বা সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে সংকটে থাকা নারীদের একটি অংশ দ্রুত বিদেশে যাওয়ার আশায় দালালদের ওপর নির্ভর করে। দালালরা উচ্চ বেতন, সহজ কাজ ও ভালো পরিবেশের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে গন্তব্য দেশে গিয়ে ভিন্ন কাজ, কম বেতন কিংবা অমানবিক কর্মপরিবেশের মুখোমুখি হন অনেক নারী। তাই নারী শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো দরকার। প্রেম বা বিয়ের ফাঁদে ফেলেও বিদেশে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে সতর্ক করেন তিনি।

এ বিষয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, বিদেশে কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতার জন্য নারীরা যথাযথভাবে প্রস্তুত নন। দক্ষতার ঘাটতির কারণে তাঁদের বড় অংশ গৃহকর্মী বা অনানুষ্ঠানিক কাজে আটকে থাকেন। তাই বিদেশ যাওয়ার আগে ভাষা, কাজের দক্ষতা ও গন্তব্য দেশের আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, ইন্দোনেশিয়াসহ কিছু দেশ নারী কর্মীদের পরিচর্যা ও নার্সিংয়ের মতো কাজে প্রশিক্ষিত করে অদক্ষ গৃহকর্মের বাইরে নিয়ে আসছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram