ঢাকা
logo
প্রকাশিত : July 23, 2026

বন্যায় ৬ লাখ টন চাল উৎপাদন কমার শঙ্কা

মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে দুই দফায় উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল ও রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে দেশের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাত। দেশের পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকার বন্যার ক্ষত শুকাতে না শুকাতে চট্টগ্রামে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।

এসব অঞ্চলের কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে নানা পরিকল্পনা গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বন্যায় দেশে চালের মোট ঘাটতি ছয়-সাত লাখ টনে পৌঁছাতে পারে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ২৬ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যায় দেশের হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। মোট আর্থিক ক্ষতি প্রায় এক হাজার ৪৭ কোটি টাকা।

হাওরের মোট কৃষিজমির ১০.৭৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৪৯ হাজার ৭৩ হেক্টর জমির বোরো ফসল নষ্ট হয়েছে, যাতে ধানের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে প্রায় দুই লাখ ১৩ হাজার টন। আকস্মিক এই দুর্যোগে প্রায় দুই লাখ ৩৬ হাজার কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন।

হাওরের বন্যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় যে ধাক্কা দিয়েছিল, চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক বন্যায় কৃষি আরো ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তলিয়ে যাওয়া ফসল, ভেসে যাওয়া হাজারো মাছের ঘের আর গবাদি পশুর ক্ষতি গ্রামীণ অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলেছে।

এক লাখ ১৪ হাজার হেক্টর জমি প্লাবিত হওয়ায় ঝুঁকিতে আউশ ও আমন : চলতি মাসে চট্টগ্রামে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে এই বিভাগের জেলাগুলোসহ মোট ৪৩ জেলার কৃষি ক্ষতির মুখে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত ৬ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশের এক লাখ ১৪ হাজার ৭২৩ হেক্টর ফসলি জমি বানের পানিতে তলিয়ে যায়। এতে সংকটে পড়েন পাঁচ লাখ ২৬ হাজার ৮৭৪ জন প্রান্তিক কৃষক।

চলতি মৌসুমে চট্টগ্রামে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আউশ ও আমনের চাষাবাদের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।

তবে টানা ১০ থেকে ১২ দিন পাঁচ থেকে সাত ফুট পানির নিচে তলিয়ে থেকে বোনা ও রোপা আউশের ক্ষেত পচে গেছে। এই জেলায় প্রায় ১২ হাজার ৫০০ হেক্টর আমন বীজতলা নষ্ট হওয়ায় আগামী মৌসুমে তীব্র চারাসংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন জানান, পাহাড়ি ও সমতল অঞ্চলের পেয়ারা বাগানসহ লেবু ও আনারস বাগানের শিকড় পচে গেছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাপক ক্ষতি : চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলার ৩৫ হাজার ৫০০ পুকুর ও চিংড়ি ঘের ভেসে যাওয়ায় অনেক চাষি এখন নিঃস্ব। মা মাছের হ্যাচারি প্লাবিত হওয়ায় রুই মাছের লাখ লাখ পোনা নষ্ট হয়েছে। চারণভূমি ডুবে যাওয়ায় গোখাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ডেইরি ও পোলট্রি খামারে গবাদি পশু ও কয়েক লাখ মুরগি মারা গেছে এবং দুধের উৎপাদন কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ। সরকারি হিসাবে এই খাতে ৪৫০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. মো. তারেক হোসেন বলেন, বন্যার পর গবাদি পশুর মধ্যে সাধারণত বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রয়োজনীয় টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। উপপরিচালক বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকট হলো গোখাদ্যের অভাব। অনেক এলাকার ঘাসের মাঠ, খড় ও পশুখাদ্যের মজুদ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় খামারিরা বেশ সংকটে পড়েছেন। এ পরিস্থিতিতে গোখাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রতিটি জেলায় মানুষের বিভিন্ন সহায়তার পাশাপাশি পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকার গোখাদ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনিম্যাল সায়েন্স ও ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. কে বি এম সাইফুল ইসলাম বলেন, বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন শুধু ত্রাণ বিতরণে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, জরুরি ভিত্তিতে গোখাদ্য, ওষুধ ও টিকাদান জোরদার করতে হবে।

মাঠে নানা চ্যালেঞ্জ : কৃষি ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় একাধিক মূল সংকট চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, আমন মৌসুমের শেষ মুহূর্তে নতুন বীজতলা তৈরি করা অসম্ভব। অন্য জেলা থেকে চারা এনে সরবরাহ করা না গেলে বিশাল জমি অনাবাদি থেকে যাবে। কৃষক-খামারিরা ব্যাংক বা এনজিওর ঋণে বিনিয়োগ করেছিলেন। পুঁজি হারিয়ে তাঁরা এখন নিঃস্ব। তাঁদের বিষয়টি ভাবতে হবে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম খানের মতে, বন্যায় আউশের প্রায় ১৫ শতাংশ ক্ষতি হলে উৎপাদন অন্তত সাড়ে চার লাখ টন কমে যেতে পারে। হাওর অঞ্চলের আগের ক্ষতির সঙ্গে এই ক্ষতি যোগ হলে দেশে মোট চালের ঘাটতি ছয় থেকে সাত লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। এ পরিস্থিতিতে চালের চাহিদা মেটাতে প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারের কার্যকর নজরদারি জরুরি। তিনি বলেন, বন্যায় সবজিরও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। এ জন্য এখন থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। শীতকালীন সবজির আবাদ সম্প্রসারণ করে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো গেলে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যাবে।

সম্প্রতি বন্যাকবলিক এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, বন্যাকবলিত চট্টগ্রাম অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি। সরকারের পক্ষে একবারে সব ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব না হলেও কৃষকদের দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বীজ, সার, গবাদি পশুর ভ্যাকসিন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram