ঢাকা
logo
প্রকাশিত : June 30, 2026

বিটিভি প্রাঙ্গণে মুস্তাফা মনোয়ারকে শেষ শ্রদ্ধা

শেষবারের মত কফিনবন্দি হয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রাঙ্গণে ফিরলেন বরেণ্য চিত্রশিল্পী, পাপেট চর্চার অন্যতম প্রাণপুরুষ ‘পাপেটম্যান’ খ্যাত মুস্তাফা মনোয়ার।

তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে জড়ো হয়েছিলেন সহকর্মী, গুণগ্রাহীরা, ছিলেন সরকারের মন্ত্রীরাও।

মঙ্গলবার সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহবাহী গাড়িটি বিটিভি প্রাঙ্গণে এসে পৌঁছায়। গাড়িটি পৌঁছালে সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এরপর সকাল ৯টা ৫২ মিনিটে বিটিভি প্রাঙ্গণেই তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

জানাজায় উপস্থিত ছিলেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, বিটিভির মহাপরিচালক মো. মাহবুবুল আলম, নাট্যকার ম হামিদ, চ্যানেল আইয়ের বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজসহ সংস্কৃতির নানা অঙ্গনের অনেকে।

'তিনি ছিলেন ফ্রেন্ড, ফিলোসফার অ্যান্ড গাইড'

জানাজা শেষে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন নাট্যকার ম হামিদ। মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান স্মরণ করে তিনি বলেন, "মুস্তাফা মনোয়ার কার গুরু ছিলেন না, এটা খুঁজে বের করা মুশকিল। বিশেষ করে টেলিভিশন ও শিল্প সংশ্লিষ্ট যারা আছেন, উনি সবারই শিক্ষক ছিলেন। তিনি ছিলেন আমাদের ফ্রেন্ড, ফিলোসফার অ্যান্ড গাইড। তার সঙ্গে যেমন জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যেত, তেমনি আড্ডার মধ্যেও শেখার অনেক কিছু থাকত।

বাংলাদেশ টেলিভিশনকে গড়ে তোলার পেছনে তার ভূমিকার কথা তুলে ধরে ম হামিদ আরও বলেন, "এখানকার কর্মী-কর্মকর্তা যারা আছেন, প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে তার ছাত্র। বিটিভির সামগ্রিক চিত্রে তার ভূমিকা অসাধারণ। এমনকি তিনি আমার পেশাটাও বদলে দিয়েছিলেন। আমি বিসিএস অ্যাডমিন ক্যাডারের চাকরি পেয়েছিলাম। উনি আমাকে বললেন 'ওখানে তোমার জায়গা না, তুমি টেলিভিশনে আসো।' তার কথাতেই আমি টেলিভিশনে আসি এবং আজীবন এই পেশাটাকে আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করেছি।"

'তিনি ছিলেন প্রেরণার উৎস'

বিটিভির মহাপরিচালক মো. মাহবুবুল আলম বলেন, "মুস্তাফা মনোয়ার স্যার ছিলেন আমাদের প্রেরণার উৎস। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এমন কোনো অঙ্গন নেই যেখানে তার ছোঁয়া নেই।

“তিনি শুধু বাংলাদেশ টেলিভিশনেরই মহাপরিচালক ছিলেন না, শিল্পকলা একাডেমিসহ দেশের শিল্প-সংস্কৃতির শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোকে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন।"

'অন্তর্গতভাবেই তিনি ছিলেন খাঁটি শিল্পী’

জানাজায় অংশ নিয়ে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এই চারুশিল্পীর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

মন্ত্রী বলেন, "দেশের সমস্ত প্রতিভাবান মানুষের তালিকা করলে প্রথম সারিতে থাকবেন মুস্তাফা মনোয়ার। আমাদের কৈশোর থেকেই আমরা তার বহুমুখী প্রতিভার সঙ্গে পরিচিত। তিনি অন্তর্গতভাবেই একজন খাঁটি শিল্পী ছিলেন। যেখানেই দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেই তার দক্ষতা, যোগ্যতা ও মননশীলতার ছাপ রেখে গেছেন।"

তিনি আরও বলেন, "আমাদের সৌভাগ্য যে, তার অন্তিম যাত্রার সময় দীর্ঘদিনের চেনা এই বিটিভি প্রাঙ্গণে আমরা সবাই তার জানাজায় অংশ নিতে পেরেছি। তথ্য মন্ত্রণালয় ও বিটিভি পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা তার জান্নাত কামনা করছি।"

বিটিভি প্রাঙ্গণে জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মুস্তফা মনোয়ারের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় শহীদ মিনারে।

আগ্রহের জায়গা টেলিভিশন

তার আগ্রহ এবং কাজের জায়গা ছিল টেলিভিশন। ১৯৬৫ সালে ডিআইটি ভবনে পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্র চালু হলে চারুকলার চাকরি ছেড়ে সেখানে যোগ দেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার টেলিভিশনে যোগ দেওয়ার কারণ ছিল বৈরী সময়ে বাংলার সংস্কৃতিকে সামনে তুলে ধরা।

তখন টেলিভিশনে দিনের অনুষ্ঠান শেষে জাতীয় সংগীতের সঙ্গে পতাকা ওড়ানো দেখানো হত। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ মুস্তাফা মনোয়ারসহ পিটিভি ঢাকা কেন্দ্রের কর্মকর্তারা ঠিক করলেন, পাকিস্তান দিবসে তারা পাকিস্তানের পতাকা টেলিভিশনে দেখাবেন না।

সেজন্য তারা এক কৌশল করলেন। দিনের অনুষ্ঠানমালা শেষ হওয়ার কথা রাত ১০টায়। কিন্তু সেদিন তারা অনুষ্ঠান শেষ করতে রাত ১২টা পার করে দিলেন। ততক্ষণে তারিখ বদলে ২৪ মার্চ হয়ে গেছে। তখন পতাকা দেখিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করা হল বটে, কিন্তু পাকিস্তান দিবসে তারা পাকিস্তানের পতাকা টেলিভিশনে দেখানো হল না।

ওই মাসেই টেলিভিশন থেকে ফজল-এ- খোদার রচনায় এবং আজাদ রহমানের সুরে 'সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম, চলবে দিনরাত অবিরাম' গণসংগীতটি প্রচারিত হয়েছিল মুস্তাফা মনোয়ারের পরিচালনায়।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদানও অনন্য। বিটিভিতে উপ মহাপরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭৩ সালে রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবীর টেলিভিশন নাট্যরূপ দেন মুস্তাফা মনোয়ার। শেক্সপিয়ারের টেমিং অব দ্য শ্রু অবলম্বনে মুনীর চৌধুরীর অনুবাদ করা ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ নাটকটিও বিটিভিতে প্রচার হয়েছিল মুস্তাফা মনোয়ারের পরিচালনায়।

যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টিভির ‘ওয়ার্ল্ড হিস্টি অব টিভি ড্রামা’র জন্য এই নাটক দুটি মনোনীত হয়েছিল।

বনানীতে দাফন

দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে ভুগে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে এই সব্যসাচী শিল্পীর মৃত্যু হয়। মুস্তাফা মনোয়ারের বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।

সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সেখানেই রাখা হবে বলে সোমবার চিত্রশিল্পী মনিরুজ্জামান জানিয়েছিলেন।

শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব শেষে শহীদ মিনার থেকে মরদেহ নেওয়া হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে, সেখানে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মরদেহ আধা ঘণ্টার জন্য নেওয়া হবে তার প্রিয় কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। তারপর বিকালে বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হবে মুস্তাফা মনোয়ারকে।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram