ঢাকা
৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সকাল ১০:০৭
logo
প্রকাশিত : জুন ৪, ২০২৬

বিদ্যুতের দামে লাফ, বাড়ছে সংসার-কৃষি ও শিল্পের ব্যয়

দেশে ২৭ মাস পর বিদ্যুতের খুচরা দাম বাড়ল। গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট (কিলোওয়াট) বিদ্যুতের গড় দাম ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। গ্রাহকশ্রেণিভেদে ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় এ সেবাপণ্যের দাম। চলতি জুনের এক তারিখ থেকেই নতুন দরে বিদ্যুৎ কিনতে হবে জনগণকে।

এখন পর্যন্ত দেশে একবারে ও একধাপে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির পরিমাণে এটি সর্বোচ্চ। তবে বৃদ্ধির হার বিবেচনায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সব মিলিয়ে জ্বালানি তেল ও খাওয়ার তেলসহ নিত্য ব্যবহূত পণ্যের দাম বৃদ্ধির মধ্যে বিদ্যুতের এ মূল্যবৃদ্ধি সংসার খরচ মেটাতে সীমিত ও নির্ধারিত আয়ের জনগণের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করবে। বিভিন্ন কৃষি ও শিল্পপণ্য উৎপাদনে খরচ বাড়াবে। সরকারি কর্মচারীদের বেতনবৃদ্ধির আগমুহূর্তে এ মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির ধাক্কাও বড় করবে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গতকাল বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুতের নতুন খুচরা মূল্যহার ঘোষণা করে। বিদ্যুতের পাইকারি দাম ও সঞ্চালন মাশুলও বাড়িয়ে পুনর্নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি। বিদ্যুতের চাপ ও ব্যবহূত পরিমাণ যত বেশি, গ্রাহকশ্রেণি অনুযায়ী বিদ্যুতের দামও তত বেশি। এই সূত্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের সর্বনিম্ন দাম ৫ টাকা ৩২ পয়সা—লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্যই রয়েছে। সর্বোচ্চ দরে ২৩ টাকা ৮১ পয়সায় বিদ্যুৎ কিনতে হবে এলটি-টি অস্থায়ী গ্রাহকদের।

সংবাদ সম্মেলনে নতুন দর ঘোষণা দেন বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সদস্য আব্দুর রাজ্জাক, মিজানুর রহমান, সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার।

নিম্নআয়ের সংসারে বেশি চাপ

২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশে বিদ্যুৎ বিতরণকারী ছয়টি সংস্থার মোট গ্রাহকসংখ্যা ৪ কোটি ৯৮ লাখ ৪ হাজার ৪৮১। এর মধ্যে গৃহস্থালি গ্রাহক ৪ কোটি ২৫ লাখ ৭৪ হাজার ১২১। বর্তমানে পিডিবি, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাধীন ৮০টি সমিতি, ডিপিডিসি, ডেসকো, ওজোপাডিকো ও নেসকো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণ করছে। সব সংস্থা ও কোম্পানি মিলিয়ে লাইফলাইন গ্রাহকসংখ্যা ১ কোটি ৭৮ লাখ ৮২ হাজার ৩৮০। এর মধ্যে সিংহভাগ ১ কোটি ৬১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৯১ গ্রাহকই পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের। আবাসিক গ্রাহকদের প্রায় ৪২ শতাংশই লাইফলাইন শ্রেণির। যেসব গ্রাহকের বিদ্যুতের ব্যবহার মাসে ৫০ কিলোওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাদেরকে লাইফলাইন গ্রাহক বলা হয়। এগুলো সীমিত আয় ও সীমিত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী পরিবার। এদের বড় অংশ কৃষি, দিনমজুরি ও অনানুষ্ঠানিক খাতের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। একটি বড় অংশের নিয়মিত আয়ও থাকে না। ফলে তাদের বিদ্যুৎ ব্যয় বৃদ্ধি সরাসরি পারিবারিক ব্যয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

আবাসিকে খরচ বাড়বে ১৫ থেকে ১৯.৯৪ শতাংশ

আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬.৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। সর্বনিম্ন লাইফলাইন গ্রাহকের ১৫ শতাংশ, আর সর্বোচ্চ ১৯.৯৪ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়েছে। ৫০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহাকারী গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল মাসে ৩৫ টাকার মতো বেড়ে যাবে। আর আবাসিকে যারা ৬০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহার করেন, তাদের বিল বাড়বে প্রায় ১ হাজার ৬৪৪ টাকা। আনুপাতিকহারে বাড়বে ভ্যাটের পরিমাণও। আবাসিকে আরো ছয়টি ধাপ রয়েছে। প্রথম ধাপে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারীর বিল ইউনিটপ্রতি ৫.২৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬.১৮ টাকা, দ্বিতীয় ধাপে ৭৬-২০০ ইউনিট পর্যন্ত ৭.২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮.৫০ টাকা, ২০১-৩০০ ইউনিট পর্যন্ত ৭.৫৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯.১০ টাকা ৩০১-৪০০ ইউনিট পর্যন্ত ৮.০২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯.৬২ টাকা, ৪০১-৬০০ ইউনিট ১২.৬৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫.০১ টাকা এবং সর্বশেষ ধাপ ৬০০ ইউনিটের ঊর্ধ্বে ব্যবহারকারীদের বিল ইউনিট প্রতি ১৪.৬১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭.৩৫ করা হয়েছে। এই দর নিম্নচাপ শ্রেণির গ্রাহকদের জন্য প্রযোজ্য।

মধ্যমচাপে (১১ কেভি) ৫০ কিলোওয়াট থেকে ৫ মেগাওয়াট পর্য‌ন্ত গ্রাহকদের ফ্ল্যাট রেট ১০.৫৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২.৫০ টাকা, অফ-পিকআওয়ারে ৯.৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১.২৫ টাকা এবং পিকআওয়ারে (সান্ধ্যকালীন) ১৩.২৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫.৬২ টাকা টাকা করা হয়েছে। অন্যদিকে কৃষি সেচের (নিম্নচাপ) দর ইউনিট প্রতি ৫.২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬.০৪ টাকা করা হয়েছে। সেচে মধ্যমচাপে (১১ কেভি) ফ্ল্যাট রেটে ৬.৪২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭.৩৮ টাকা, অফ-পিকে ৮.৬৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬.৬৪ টাকা, পিকে ৮.০৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯.২৩ টাকা করা হয়েছে।

কৃষি সেচে ইউনিট প্রতি ৭৯ পয়সা, হাসপাতালে ১.৫০ টাকা বৃদ্ধি

সেচ, রাস্তার বাতি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ব্যাটারি চার্জিংয়ে গুনতে হবে বাড়তি বিল। নিম্নচাপে সেচে ৫.২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬.০৪ টাকা এবং ব্যাটারি চার্জিংয়ে পিকে ১২.১৪ টাকা বাড়িয়ে ১৪.২০ টাকা অফ-পিকে ৮.৬৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০.২২ টাকা করা হয়েছে।

বৈদ্যুতিক যানবাহন ও ব্যাটারি চার্জিংয়ে (নিম্নচাপ) ফ্ল্যাট রেট ইউনিট প্রতি ৯.৫৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১.৩৬ টাকা অফ-পিকে ৮.৬৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০.২২ টাকা, ‍সুপার অফ-পিকে ৭.৭১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯.০৯ টাকা এবং পিকে ১২.১৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪.২০ টাকা করা হয়েছে। ব্যাটারি চার্জিংয়ে (মধ্যমচাপ ১১ কেভি) ফ্ল্যাট রেট ইউনিট প্রতি ৯.৬২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১.৩১ টাকা অফ-পিকে ১০.১৮, সুপার অফ-পিকে ৯.০৫ টাকা এবং পিকে ১৪.১৪ টাকা করা হয়েছে।

অন্যদিকে কৃষি সেচে (মধ্যমচাপ) ফ্ল্যাট রেট ৬.৪২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭.৩৮ টাকা, অফ-পিকে ৫.৭৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬.৬৪ টাকা এবং পিকে ৮.০৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯.২৩ টাকা করা হয়েছে। নিম্নচাপে শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালে ইউনিট প্রতি ৭.৫৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯.০৫ টাকা করা হয়েছে।

ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পে বাড়তি খরচ

নিম্নচাপে (২৩০/৪০০ ভোল্ট) ক্ষুদ্র ‍ও কুটিরশিল্পের জন্য পিক আওয়ারে ইউনিট প্রতি ১২.৯৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫.২৭ টাকা; অফ-পিকে ৯.৬৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১.৪৫ টাকা এবং ফ্ল্যাট রেট ১০.৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২.৭৩ টাকা করা হয়েছে। নিম্নচাপে বাণিজ্যিক ও অফিসের জন্য পিক আওয়ারে ইউনিট প্রতি ১৫.৬২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮.৪৩ টাকা; অফ-পিকে ১১.৭১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩.৮২ টাকা এবং ফ্ল্যাট রেট ১৩.০১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫.৩৬ টাকা করা হয়েছে।

মধ্যমচাপ (১১ কেভি) বাণিজ্যিক ও অফিসের জন্য পিকে ইউনিট প্রতি ১৪.৫৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭.৪১ টাকা; অফ-পিকে ১০.৪৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২.৫৪ টাকা এবং ফ্ল্যাট রেট ১১.৬৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩.৯৩ টাকা করা হয়েছে। উচ্চচাপে (৩৩ কেভি) পিকে ১৪.৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭.০৫ টাকা; অফ-পিকে ১০.২৬ থেকে বাড়িয়ে ১২.২৮ টাকা, ফ্ল্যাট রেটে ১১.৩৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩.৬৩ টাকা করা হয়েছে। উচ্চচাপ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পিকে ১৩.৪৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫.৯৩ টাকা; অফ-পিকে ৯.৬৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১.৪৭ টাকা, ফ্ল্যাট রেটে ১০.৭৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২.৭৫ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া অতি উচ্চচাপ (১৩২ কেভি এবং ২৩০ কেভি) ইএইচটি-১ সাধারণ এবং ইএইচটি-২ সাধারণ শ্রেণিতেও দাম বাড়ানো হয়েছে।

পাইকারি ও সঞ্চালন মাশুল

পাইকারিতে বর্তমানে ইউনিট প্রতি দর ৭.০৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে গড় দাম ৮.৩৯ টাকা করা হয়েছে। অন্যদিকে সঞ্চালন মাশুল (গড়) ইউনিট প্রতি ৩১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। বিদ্যুতের একমাত্র সঞ্চালন কোম্পানি পিজিসিবি (পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি), প্রতি ইউনিটে যথাক্রমে ৩০ ও ৩১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪৮ ও ৪৯ পয়সা করার আবেদন করেছিল।

৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে সরকারকে

পাইকারি বিদ্যুতের দাম ১৯.৮৫ শতাংশ বাড়ানোর পরও বছরে ৪১ হাজার কোটি টাকা লোকসান হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। এই টাকা পিডিবিকে ভর্তুকি হিসেবে দিতে হবে সরকারকে।

বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, বিদ্যুতের বর্তমান পাইকারি দর ইউনিট প্রতি ৭ টাকা থেকে গড়ে ১.৩৯ টাকা বাড়িয়ে ৮.৩৯ টাকা করা হয়েছে। ইউনিট প্রতি গড়ে ১.৩৯ টাকা বৃদ্ধিতে ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা বাড়তি আয় হবে। এর পরও ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram