

সাগরের ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)।
আগের দরপত্রে বাইরের কোম্পানিগুলোর সাড়া না মেলায় এবার আগ্রহীদের মতামত ও পরামর্শ বিবেচনায় নিয়ে এগোনোর কথা বলেছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি।
পেট্রোবাংলা বলেছে, এর অংশ হিসেবে তারা নতুন ‘মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্র্যাক্ট’ (এমপিএসসি) প্রস্তুত করেছে।
রোববার সচিবালয়ে ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬, বিডিং রাউন্ড ২০২৬’ শিরোনামে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানাবে পেট্রোবাংলা।
পেট্রোবাংলার পরিচালক প্রকৌশলী মো. শোয়েব (প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট) গণমাধ্যমকে বলেন, “আগের দরপত্রে যারা ডকুমেন্ট কিনেছিল, কিন্তু বিড জমা দেয়নি, তাদের মতামত নেওয়া হয়েছে।
“তাদের কাছে আমরা কারণ জানতে চেয়েছিলাম। মূলত তাদের পরামর্শ এবং আমাদের কনসালট্যান্টদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়েই মডেল পিএসসি ২০২৬ প্রস্তুত করা হয়েছে।”
নতুন মডেল পিএসসিতে আন্তর্জাতিক কোম্পানির আগ্রহ বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।
শোয়েব বলেন, “তাদের কিছু বিষয় এখানে এসেছে। আমরা দেখেছি, আন্তর্জাতিকভাবে এসব বিষয় থাকে। এজন্য মনে করছি, এবার ভালো সাড়া পাব।”
পেট্রোবাংলার দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সমুদ্রের ১১টি অগভীর ব্লক এবং ১৫টি গভীর ব্লক তেল গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে।
অগভীর ব্লকগুলো হলো ‘এসএস ০১’ থেকে ‘এসএস ১১’ পর্যন্ত। গভীর সমুদ্রের ব্লকগুলো হলো ‘ডিএস ০৮’ থেকে ‘ডিএস ২২’।
কোম্পানিগুলো এককভাবে অথবা যৌথভাবে এক বা একাধিক ব্লকের জন্য দরপত্রে অংশ নিতে পারবে। একটি টেন্ডার শিডিউল কিনেই একাধিক ব্লকে অংশ নেওয়া যাবে। তবে প্রতিটি অগভীর ও গভীর সমুদ্র ব্লকের জন্য আলাদা আবেদন জমা দিতে হবে।
পাশাপাশি থাকা দুটি গভীর সমুদ্র ব্লকের জন্য একটি চুক্তির সুযোগ রাখা হয়েছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক শোয়েব বলেছেন, ‘সিগনেচার বোনাস’ না থাকা, রয়্যালটি না থাকা, শতভাগ কস্ট রিকভারি এবং করপোরেট আয়কর পেট্রোবাংলার বহনের মতো সুবিধা আগের পিএসসিতে ছিল।
তিনি বলেন, “এগুলো আগেও ছিল। আমরা মূলত এবার পাইপলাইন ট্যারিফটা যোগ করেছি। আর আগে দশ বছর পর ৫০ শতাংশ এলাকা ছেড়ে দেওয়ার বিষয় ছিল, সেটা এখন ২০ শতাংশ করা হয়েছে। তার মানে ৮০ শতাংশ এলাকায় তারা আরও সিসমিক বা এক্সপ্লোরেশনের জন্য সময় পাবে।”
নতুন মডেল পিএসসিতে ঠিকাদার কোম্পানিগুলো অর্জিত মুনাফা পুরোপুরি নিজ দেশে ফেরত নিতে পারবে। কোনো সিগনেচার বোনাস বা রয়্যালটি দিতে হবে না।
অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও উৎপাদন পর্যায়ে আমদানি করা যন্ত্রপাতি ও মেশিনারিতে শুল্ক অব্যাহতির সুবিধা রাখা হয়েছে।
ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের করপোরেট আয়করও পেট্রোবাংলা বহন করবে।
অগভীর ও গভীর সমুদ্র— উভয় ক্ষেত্রেই শতভাগ কস্ট রিকভারি বা ব্যয় পুনরুদ্ধারের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে বছরে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় তুলে নেওয়া যাবে।
গ্যাসের দাম আন্তর্জাতিক ব্রেন্ট ক্রুডের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। গত পাঁচ বছরের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গড় ব্রেন্ট মূল্যের ভিত্তিতে ফ্লোর ও সিলিং নির্ধারণ করা হবে।
পাইপলাইন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে আলাদা পাইপলাইন ট্যারিফের বিধান রাখা হয়েছে, যা ক্রেতা পরিশোধ করবে।
পেট্রোলিয়াম মুনাফা ভাগাভাগি হবে ‘আর-ফ্যাক্টর’ ভিত্তিতে। দরদাতারা নিজেদের প্রস্তাবে এর সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সীমা তুলে ধরতে পারবে।
তেলের দাম নির্ধারণ হবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বাজারের প্রচলিত ন্যায্য মূল্যের ভিত্তিতে।
সাগরে তেল-গ্যাস খুঁজতে ‘আগ্রহীদের পরামর্শে’ নতুন পিএসসি
বড় আর্থিক সুবিধা দেওয়ার পরও বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে বলে মনে করছেন পেট্রোবাংলার পরিচালক শোয়েব। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “আমরা এই জায়গাটায় এখনও একেবারেই ব্লাইন্ড, বিশেষ করে ডিপ সিতে। অগভীর অংশে একসময় কাজ ছিল, কিন্তু এখন সেখানেও আমাদের কোনো কাজ নেই।”
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমুদ্রে অনুসন্ধান ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল হওয়ায় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে টানতে আর্থিক শর্তে ছাড় দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। তবে দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস মিললে তা আমদানিনির্ভরতা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
দরপত্রে অংশ নিতে হলে কোম্পানিকে অন্তত একটি অফশোর ব্লকের অপারেটর হতে হবে।
অগভীর সমুদ্র ব্লকের জন্য দৈনিক অন্তত ৫ হাজার ব্যারেল তেল অথবা ৭৫ এমএমসিএফডি গ্যাস উৎপাদনের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
গভীর সমুদ্র ব্লকের জন্য দৈনিক অন্তত ১০ হাজার ব্যারেল তেল অথবা ১০০ এমএমসিএফডি গ্যাস উৎপাদনের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
নিজ দেশের বাইরে অন্তত একটি দেশে তেল গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনের অভিজ্ঞতাও বাধ্যতামূলক।
অপারেটরশিপ ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার প্রমাণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট দেশ, রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি, নিয়ন্ত্রক সংস্থা অথবা সরকারি সংস্থার সনদ বা প্রমাণপত্র দিতে হবে।
বাধ্যতামূলক কাজের অংশ সীমিত রাখা হয়েছে ‘টু-ডি সিসমিক জরিপে। তবে দরদাতাদের বাধ্যতামূলক কাজের বাইরে অতিরিক্ত কাজের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
কোনো কোম্পানি সংশ্লিষ্ট ব্লকের বিদ্যমান ‘টু-ডি মাল্টিক্লায়েন্ট সিসমিক ডেটা কিনলে বাধ্যতামূলক কাজের পরিমাণ আনুপাতিক হারে কমানো যাবে।
প্রথম অনুসন্ধান কূপ শুকিয়ে গেলে অথবা বাণিজ্যিকভাবে অকার্যকর হলে দ্বিতীয় বা পরবর্তী কূপের ক্ষেত্রে ঠিকাদারের মুনাফার ভাগ বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।
পেট্রোবাংলা গ্যাস কিনতে না পারলে ঠিকাদার কোম্পানি দেশের ভেতরে তৃতীয় পক্ষের কাছে নিজেদের অংশের গ্যাস বিক্রি করতে পারবে। তবে পেট্রোবাংলার অধিকার থাকবে সবার আগে।
একই শর্তে ঠিকাদার অংশের গ্যাস রপ্তানির সুযোগও রাখা হয়েছে।
অগভীর সমুদ্র ব্লকে বাপেক্সের জন্য ১০ শতাংশ ক্যারিড ইন্টারেস্ট রাখা হয়েছে।
চুক্তি সইয়ের পর ন্যূনতম অনুসন্ধান কর্মসূচি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা হিসেবে নির্ধারিত ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দিতে হবে।
তবে সরকার কোনো সফল দরদাতার হাতে ব্লকের সংখ্যা সীমিত রাখার অধিকার সংরক্ষণ করেছে।
নতুন দরপত্র ঘিরে এখন পর্যন্ত কোনো কোম্পানি যোগাযোগ করেছে কি না জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার পরিচালক শোয়েব বলেন, “এখনও সময় হয়নি। তবে গতবার যে কোম্পানিগুলো দরপত্র কিনেছিল, তারা আমাদের ডেটাগুলো নিয়েছে। তারা হয়ত অপেক্ষা করছে।”
আগের দরপত্রে সাতটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত কোনো প্রস্তাব জমা পড়েনি বলে জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
দরপত্র জমা নভেম্বর পর্যন্ত
পেট্রোবাংলা বলেছে, ১ জুন থেকে ‘বেসিক ইনফরমেশন’ প্যাকেজ পাওয়া যাবে। এর মূল্য ১০০ ডলার অথবা সমপরিমাণ টাকা।
বিডিং ডকুমেন্টসহ প্রমোশনাল প্যাকেজের দাম ৭ হাজার ডলার অথবা সমপরিমাণ টাকা। এই প্যাকেজ কেনা দরপত্রে অংশগ্রহণের জন্য বাধ্যতামূলক।
আরও বিস্তারিত সিসমিক, গ্র্যাভিটি, ম্যাগনেটিক ও ভূতাত্ত্বিক তথ্যের জন্য আলাদা প্যাকেজ থাকবে।
দরপত্র জমার শেষ সময় ৩০ নভেম্বর দুপুর ১টা। একই দিন দুপুর ২টায় পেট্রোবাংলা কার্যালয়ে দরপত্র খোলা হবে।
ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের সমুদ্রে বড় আকারে বাণিজ্যিক তেল গ্যাস আবিষ্কার হয়নি।
২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধানের বড় সুযোগ তৈরি হয়। তবে আন্তর্জাতিক কোম্পানির আগ্রহ ধরে রাখতে পারেনি বাংলাদেশ।
২০১৯ সালে নতুন পিএসসি করা হলেও সে সময় দরপত্র ডাকা হয়নি। পরে পিএসসি ২০২৩ এর আলোকে ২০২৪ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয়।
ওই সময় টিজিএস ও শ্ল্যামবার্জারের বঙ্গোপসাগরে টু ডি জরিপের তথ্যও বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরা হয়েছিল।
তবু শেষ পর্যন্ত কোনো কোম্পানি দরপত্র জমা দেয়নি।
জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলে আসছেন, গ্যাসের দাম, পাইপলাইন ব্যয়, কস্ট রিকভারি, লাভ ভাগাভাগি ও তথ্যের সীমাবদ্ধতা বিদেশি কোম্পানির অনীহার বড় কারণ ছিল।
এর আগে গভীর সমুদ্রের দুটি ব্লকে কাজ শুরু করেছিল কনোকোফিলিপস। দ্বিমাত্রিক জরিপের পর গ্যাসের দাম নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে তারা কাজ ছেড়ে যায়।
স্যান্টোস ও পস্কো দাইয়ুও চুক্তির পর শেষ পর্যন্ত কাজ এগিয়ে নেয়নি। অগভীর সমুদ্রের এসএস ০৪ ও এসএস ০৯ ব্লকে ভারতের ওএনজিসি অনুসন্ধান চালালেও পরে তারা ছেড়ে দেয়।

