

তার জন্ম হয়েছিল ২০১৮ সালের ১৯ মে। তবে প্রতি মাসের ১৯ তারিখকেই জন্মদিন হিসেবে ধরে নিত ও। এটা-ওটা বায়না ধরত। দেয়ালে ‘১৯’ লিখতে ‘৯’-এর স্টিকার লাগিয়েছিল।
‘১’-এর স্টিকার খুঁজে ফিরছিল। কিন্তু এর আগেই যে তাকে পরপারে পাড়ি জমাতে হবে কে জানত সেটা? এখন যেকোনো মাসের ১৯ তারিখ মানেই তার পরিবারের সদস্যদের কাছে আলাদা অনুভূতির দিন। নিজেদের অজান্তেই পরিবারের সদস্যদের চোখ ছলছল করে ওঠে এই দিনে। তাদের চোখে ভেসে আসে শহীদ শিশু জাবির ইব্রাহিমের নানা স্মৃতি।
গত বছরের জুলাই গণ-অভুত্থানের বিজয় উৎসবকালে ৫ আগস্ট বিকেলে সে শহীদ হয়। দেশে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ শিশুদের একজন এই জাবির। ওই দিন সঙ্গে গিয়েছিল ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের বিজয় উদযাপন করতে। সেখানেই পুলিশের ছোড়া গুলিতে শহীদ হয় জাবির।
জাবিরদের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মনিয়ন্দ ইউনিয়নের তুলাই শিমুল গ্রামে। তাদের পরিবার ঢাকার উত্তরায় থাকত। শিশু জাবির পড়াশোনা করত উত্তরার কেসি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নার্সারি বিভাগে। দুই ভাই, এক বোনের মধ্যে জাবির ছিল সবার ছোট।
জানা গেছে, এখনো জাবির হত্যার বিচার হয়নি।
জাবিরের স্মৃতি ধরে রাখতে কিছু উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও এখনো সেটা বাস্তবায়ন হয়নি। পরিবারে এ নিয়ে আক্ষেপও রয়েছে। সম্প্রতি অবশ্য জাবির স্মরণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া উপজেলা পরিষদ মাঠে একটি গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। কয়েক দিন আগে আখাউড়ার নিজ বাড়িতে আলাপকালে জাবিরের বাবা কবির হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘ছেলের সাইকেল, কাঠের টুকরা দিয়ে বানানো ব্যাংক আমাদের কাছে স্মৃতি হয়ে আছে। এসবের মধ্যেই ছেলেকে খুঁজে ফিরি। প্রতি মাসের ১৯ তারিখ এলেই মনটা কেমন করে ওঠে। জাবির প্রতি মাসের ১৯ তারিখকেই তার জন্মদিন হিসেবে ধরে নিত। দেয়ালে লাগানো ৯ লেখা স্টিকার সরাতে দিইনি। তিনি বলেন, ‘ছেলের স্মৃতি ধরে রাখতে নিজ এলাকায় একটি সড়কের নামকরণের প্রস্তাব করেছিলাম। এ ছাড়া কোনো স্থাপনার নামকরণ করা যায় কি না সে বিষয়েও প্রশাসন আয়োজিত স্মরণসভায় অনুরোধ করেছি। কিন্তু এখনো কোনো উদ্যোগ লক্ষ করছি না। প্রশাসন বা অন্য কোনো তরফ থেকে কেউ এখন আর খোঁজও নিচ্ছে না। তবে ঢাকায় তার কবর পাকাকরণ, তার জামা-কাপড়সহ বিভিন্ন স্মৃতি সংরক্ষণ করা হবে বলে আমাকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। আশা করছি এ কাজটা হবে।’
তিনি বলেন, ‘গত বছরের ৫ আগস্ট বিকেলে গুলিতে জাবির শহীদ হয়। আমার কোলে থাকা অবস্থাতেই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর দুই বার বাবা বলে সে ডাক দেয়। ছেলের সেই ডাক এখনো কানে বাজে। এটা কোনোভাবেই ভুলবার মতো নয়।’
গত বছরের ৫ আগস্ট সকালে মাথায় একটি হেলমেট পরে জাবির তার বাবাকে বলেছিল, ‘আমি আর্মি অফিসার হবো।’ কেন? বাবার এমন প্রশ্নে জাবির বলতে থাকে, ‘আমি আর্মি হয়ে পুলিশকে মারব। পুলিশ আমার ভাইদের মারতেছে, এ জন্য তাদের মারব।’ বাড়ির সবাই তার কথায় ‘থ’ খেয়ে যায়। দুপুরের দিকে স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে ঢাকার উত্তরায় বিজয় উল্লাসে যোগ দিতে যান কবির হোসেন ভূইয়া। হাজার হাজার মানুষ তখন আনন্দ মিছিল করছিল। বেজায় খুশি ছিল শিশু জাবিরও। কখনো মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে, কখনো আঙুল উঁচিয়ে বিজয় উদযাপনে সেও ব্যস্ত। সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে কবির বলেন, ‘বিকেল সাড়ে ৪টায় একটি সেতুর ওপর থাকা অবস্থায় হঠাৎ গুলির শব্দ শুনতে পাই। লোকজনও দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। আমিও পরিবারের লোকজন নিয়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করি। জাবিরের ডান হাত ছিল আমার বাঁ হাতে ধরা। হঠাৎ একটি গুলি এসে জাবিরের পায়ে লাগে। একটু দূরে গিয়েই জাবির নিস্তেজ হয়ে পড়ে। তাকে কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে চিকিৎসকদের অনেক অবহেলা ছিল। পরে ঢাকা স্পেশালাইজড হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’
জাবিরের বয়স তখন মাত্র ছয় বছর। গত জুলাই অভ্যুত্থানে শিশুসহ অন্যদের ওপর নির্যাতন, মেরে ফেলার বিষয়টি জাবিরকে খুব পীড়া দিত।
